মানুষের অন্ত্রে বাস করে লক্ষ-কোটি অণুজীব। তারা জটিল শর্করা ভেঙে এমন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা শরীরের মোট শক্তির প্রায় দশ শতাংশ জোগাতে পারে। পাশাপাশি তারা ভিটামিন কে ও বি-গোষ্ঠীর বিভিন্ন ভিটামিন তৈরিতে সহায়তা করে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, ক্ষতিকর জীবাণুর বিস্তার ঠেকায় এবং অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত সেরোটোনিনের মতো রাসায়নিকের উৎপাদনেও প্রভাব ফেলে। ফলে অন্ত্রের অণুজীবসমষ্টিকে সুস্থ রাখা যে গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে সন্দেহের খুব কমই অবকাশ আছে।
বৈচিত্র্যই কি সুস্থ অন্ত্রের মূল চাবিকাঠি?
অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য বেশি থাকা সাধারণত ভালো বলে মনে করা হয়। কারণ বিভিন্ন ধরনের অণুজীব বিভিন্ন ধরনের খাবার ব্যবহার করে। তাই খাদ্যতালিকায় উদ্ভিদজাত খাবারের বৈচিত্র্য বাড়ানোও যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা সপ্তাহে প্রায় ৩০ ধরনের উদ্ভিদজাত খাবার খান, তাদের অন্ত্রের অণুজীবসমষ্টি যারা ১০টিরও কম ধরনের উদ্ভিদজাত খাবার খান তাদের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময়। পরে ২০২১ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও দেখা যায়, কিমচি ও সাওয়ারক্রাউটের মতো গাঁজানো খাবার অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে।
তবে এখানেই শুরু হয়েছে নতুন ব্যবসা। অনেকেই মনে করেন, শুধু বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ার পরামর্শ যথেষ্ট নয়। বরং প্রত্যেক মানুষের অন্ত্রের অণুজীবের ধরন পরীক্ষা করে তার জন্য আলাদা খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া উচিত।

মল পরীক্ষা থেকে ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা
এই ধারণাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সরাসরি ভোক্তার কাছে সেবা দেওয়া বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। তারা মলের নমুনা সংগ্রহ করে তাতে থাকা অণুজীবের বংশগত উপাদান বিশ্লেষণ করে কোন কোন জীবাণু রয়েছে, তার একটি তালিকা তৈরি করে।
এরপর তারা ব্যক্তিভেদে খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ, জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা এবং অণুজীবের জন্য উপযোগী বিশেষ খাদ্য-পরিপূরক দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। লক্ষ্য হলো পরীক্ষায় যে অণুজীবের ঘাটতি ধরা পড়েছে, তা পূরণ করা।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন—কোনটি আদর্শ অন্ত্রের অণুজীবসমষ্টি?
আসলে এমন কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ মডেল এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দুই ব্যক্তির অন্ত্রের অণুজীবের গঠন অনেকটাই আলাদা হতে পারে, অথচ দুজনের শরীরেই তা স্বাভাবিকভাবে কার্যকর হতে পারে। অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সবচেয়ে স্পষ্ট সতর্কসংকেতগুলোর একটি হলো অণুজীবের বৈচিত্র্য কমে যাওয়া। আর বৈচিত্র্যময় ও আংশিকভাবে গাঁজানো খাবার এই সমস্যার মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে।
এর বাইরে নির্দিষ্ট কোনো জীবাণু আছে বা নেই—এটিকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির স্বাস্থ্য দৃশ্যত উন্নত হবে, এমন দাবির পক্ষে এখনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুবই সীমিত। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার নিজেদের দাবির পেছনে ব্যবহৃত তথ্য ও পদ্ধতির বিস্তারিত প্রকাশও করে না।
ব্যতিক্রমও আছে
তবে সব প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে দেখা ঠিক হবে না। যুক্তরাজ্যের গবেষক টিম স্পেক্টর একদিকে লন্ডনের কিংস কলেজের সঙ্গে একাডেমিক গবেষণায় যুক্ত, অন্যদিকে ব্যক্তিগত অণুজীব বিশ্লেষণভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতাও।
সেই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের অনুমোদন নিয়ে পাওয়া তথ্য গবেষণায় ব্যবহার করা হয় এবং সেগুলো মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব গবেষণার ইঙ্গিত হলো, ব্যক্তিভেদে তৈরি খাদ্যতালিকা বিশাল কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে সামান্য উপকার করতে পারে।
পরীক্ষার ফলই যদি নির্ভরযোগ্য না হয়?
ব্যক্তিগত অণুজীবভিত্তিক চিকিৎসা সত্যিই কার্যকর হতে হলে প্রথম শর্ত হলো পরীক্ষার ফল নির্ভুল হওয়া। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে আরও বড় সমস্যা।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একই ধরনের অণুজীবসমৃদ্ধ মলের ২১টি নমুনা প্রস্তুত করে। এরপর সাতটি ভিন্ন ভোক্তামুখী প্রতিষ্ঠানের কাছে তিনটি করে নমুনা পাঠানো হয়।
নমুনাগুলো অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষার ফলাফলে প্রতিষ্ঠানভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। এমনকি একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই প্রতিষ্ঠানের করা পৃথক পরীক্ষার ফলের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া যায়।
অর্থাৎ একই নমুনা পরীক্ষা করেও যদি ভিন্ন ভিন্ন ফল পাওয়া যায়, তাহলে সেই ফলের ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তির জন্য বিশেষ খাদ্যতালিকা বা অণুজীবভিত্তিক চিকিৎসা নির্ধারণ কতটা নির্ভরযোগ্য—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
ব্যক্তিগত অণুজীব চিকিৎসার যুগ কি সত্যিই আসছে?
অন্ত্রের অণুজীব নিয়ে গবেষণা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে এর চিকিৎসাগত ব্যবহার বাড়তে পারে। কিন্তু অণুজীবের বৈচিত্র্য দেখলেই যে প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা চিকিৎসা তৈরি করা সম্ভব হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।
বরং বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে সহজ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসই বেশি যুক্তিসঙ্গত পথ বলে মনে হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, শস্য ও অন্যান্য উদ্ভিদজাত খাবারের পাশাপাশি পরিমিত গাঁজানো খাবার অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
তাই অন্ত্রের অণুজীব নিয়ে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করার আগে একটি সহজ প্রশ্নই যথেষ্ট হতে পারে—নিজের খাবারের বৈচিত্র্য কি বাড়ানো যায়?
অনেক ক্ষেত্রে দামি পরীক্ষা ও বিশেষ পরিপূরকের চেয়ে রান্নাঘরের একটি পাত্র গাঁজানো খাবারই হয়তো বেশি বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















