একটি হরমোনভিত্তিক ওষুধ কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের চেহারা বদলে দিতে পারে, তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ এখন জিএলপি-১। শুরুতে বহুমূত্র রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই শ্রেণির ওষুধ পরে ওজন কমানো, হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ ও নিদ্রাজনিত শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যায় কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এই সাফল্যের পর ওষুধশিল্পের নজর এখন মস্তিষ্কের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সংকেত—ওরেক্সিনের দিকে।
গবেষকদের ধারণা, ওরেক্সিনভিত্তিক ওষুধও একদিন জিএলপি-১-এর মতো বহুমুখী চিকিৎসার নতুন অধ্যায় খুলতে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অতিরিক্ত ঘুমপ্রবণতার রোগ নারকোলেপসির চিকিৎসায় ওভেপোরেক্সটন অনুমোদন করেছে। এটি ওরেক্সিনের কার্যক্রম অনুকরণ করে মস্তিষ্ককে জাগ্রত রাখতে সাহায্য করে।
ঘুম ও জাগরণের নিয়ন্ত্রক
ওরেক্সিন হলো মস্তিষ্কের এক জোড়া গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুরাসায়নিক বার্তাবাহক। জেগে থাকা, মনোযোগ, প্রেরণা এবং মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে এদের ভূমিকা রয়েছে।
মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অঞ্চলে থাকা বিশেষ কোষ ওরেক্সিন তৈরি করে। সেখান থেকে এটি পাশের স্নায়ুকোষের দুটি বিশেষ গ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর মধ্যে দ্বিতীয় গ্রাহকটি জাগ্রত থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি নরএপিনেফ্রিন, সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো অন্যান্য স্নায়ুরাসায়নিক ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে সক্রিয় রাখে।
বিজ্ঞানীরা তাই ওরেক্সিনকে অনেকটা সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে তুলনা করেন। এটি নিজে সব যন্ত্র বাজায় না, কিন্তু বিভিন্ন ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করিয়ে মস্তিষ্ককে জাগ্রত রাখে।
নারকোলেপসির সঙ্গে সম্পর্ক
ওরেক্সিনের গুরুত্ব প্রথমে স্পষ্ট হয় নারকোলেপসি নিয়ে গবেষণায়। প্রায় তিন দশক আগে পৃথক দুটি গবেষকদল স্বাধীনভাবে এই রাসায়নিক বার্তাবাহক আবিষ্কার করে।
পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, নারকোলেপসিতে আক্রান্ত মানুষদের মস্তিষ্কে ওরেক্সিন উৎপাদনকারী বিশেষ স্নায়ুকোষ হারিয়ে যায়। প্রাণীদের ওপর পরীক্ষাতেও দেখা যায়, ওরেক্সিন না থাকলে তারা বারবার ঘুমিয়ে পড়ে এবং হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারায়।
বিশেষ করে প্রথম ধরনের নারকোলেপসিতে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমের পাশাপাশি হঠাৎ পেশিশক্তি হারানোর ঘটনা ঘটে। প্রবল হাসি, উত্তেজনা বা অন্য তীব্র আবেগের মুহূর্তেও একজন মানুষ হঠাৎ মাটিতে পড়ে যেতে পারেন।
এর কারণ বোঝার জন্য ঘুমের স্বপ্নপর্ব গুরুত্বপূর্ণ। স্বপ্নের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে শরীরের পেশিকে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়, যাতে মানুষ স্বপ্নের দৃশ্য বাস্তবে নড়াচড়া করে না দেখান। স্বাভাবিক জাগ্রত অবস্থায় ওরেক্সিন নরএপিনেফ্রিন ও সেরোটোনিনের মাধ্যমে এই নিষ্ক্রিয়তার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ওরেক্সিনের ঘাটতি হলে জেগে থাকা অবস্থাতেও সেই ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে পেশির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে পারে।
ঘুম পাড়ানো নয়, স্বাভাবিক জাগরণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
ওরেক্সিন নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথম সাফল্য ছিল এর কার্যক্রম বন্ধ করা। ২০১৪ সাল থেকে ওরেক্সিন প্রতিরোধকারী ওষুধ অনিদ্রার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ওষুধ ওরেক্সিনের সংকেত আটকে দিয়ে মস্তিষ্কের জাগ্রত থাকার প্রবণতা কমায়।
প্রচলিত ঘুমের ওষুধের সঙ্গে এর পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পুরোনো ওষুধ মস্তিষ্কের প্রধান দমনকারী স্নায়ুরাসায়নিক ব্যবস্থাকে বাড়িয়ে ঘুম আনার চেষ্টা করে। ফলে তা অনেক সময় স্বাভাবিক ঘুমের বদলে এক ধরনের অবসাদ তৈরি করে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
ওরেক্সিনভিত্তিক নতুন পদ্ধতির লক্ষ্য উল্টো। ওরেক্সিনের সংকেত ফিরিয়ে দিয়ে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক জাগ্রত ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা।
নতুন ওষুধে আশাব্যঞ্জক ফল
ওরেক্সিনকে সক্রিয় করা অবশ্য সহজ নয়। ওরেক্সিনের কার্যক্রম বন্ধ করতে শুধু এর গ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংকেত আটকে দিলেই হয়। কিন্তু সক্রিয়কারী ওষুধকে শরীরে থাকা প্রাকৃতিক ওরেক্সিনের মতো কাজ করতে হয়। একই সঙ্গে সেটিকে মস্তিষ্কের সুরক্ষাবেষ্টনী অতিক্রম করতে হয়।
একটি প্রাথমিক ওষুধে রোগীদের যকৃতের ক্ষতি দেখা দেওয়ায় সেটির উন্নয়ন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী প্রজন্মের ওভেপোরেক্সটন অবশ্য গবেষকদের নতুন আশাবাদ দিয়েছে।
একটি পরীক্ষায় ৯০ জন রোগীর ওপর আট সপ্তাহ ধরে ওষুধটি দেওয়া হয়। দেখা যায়, রোগীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় জেগে থাকতে পারছেন। মাত্রা অনুযায়ী তারা প্রায় সাড়ে ১২ থেকে ২৫ মিনিট বেশি জেগে থাকতে সক্ষম হন। অনেকের কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
একই সঙ্গে হঠাৎ পেশিশক্তি হারানোর ঘটনাও কমেছে। ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের আক্রমণ প্রতিষেধক নেওয়া রোগীদের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। তবে অনিদ্রা এবং প্রস্রাবের তাগিদ বৃদ্ধির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।
প্রচলিত উত্তেজক ওষুধের চেয়ে ভিন্ন পথ
বর্তমান নারকোলেপসি চিকিৎসায় উত্তেজক ওষুধ ও জাগ্রত রাখার ওষুধ ব্যবহৃত হয়। এগুলো ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিনের মতো স্নায়ুরাসায়নিকের কার্যক্রম বাড়িয়ে সতর্কতা বৃদ্ধি করে।

কিন্তু এসব ওষুধ মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে উদ্বেগ, রক্তচাপ বৃদ্ধি, ঘুমের সমস্যা এবং কিছু ক্ষেত্রে আসক্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ওরেক্সিনভিত্তিক ওষুধ আরও ওপরের স্তরে কাজ করে পুরো জাগ্রত থাকার ব্যবস্থাকে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। গবেষকদের আশা, এতে আরও স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল জাগরণ পাওয়া যাবে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলক কম হতে পারে।
নারকোলেপসির বাইরে আরও বড় বাজার
ওরেক্সিনভিত্তিক চিকিৎসার সম্ভাবনা শুধু নারকোলেপসিতে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয় ধরনের নারকোলেপসি এবং অজ্ঞাত কারণে অতিরিক্ত ঘুমের রোগের চিকিৎসাতেও নতুন ওষুধ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ছোট পরিসরের একটি পরীক্ষায় ৫৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধটি প্রথম ধরনের নারকোলেপসিতে জেগে থাকার সময় ২০ মিনিটের বেশি এবং দ্বিতীয় ধরনের নারকোলেপসিতে ১০ মিনিটের বেশি বাড়িয়েছে।
এরপর নজর পড়েছে আরও সাধারণ রোগের দিকে। মনোযোগ ঘাটতি ও অতিচঞ্চলতা রোগের ক্ষেত্রেও ওরেক্সিনভিত্তিক ওষুধ পরীক্ষা করা হচ্ছে। নারকোলেপসির রোগীদের মনোযোগ বৃদ্ধির পর্যবেক্ষণ থেকেই এই সম্ভাবনার ধারণা এসেছে।
ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার রোগ নিয়েও গবেষণা চলছে, যদিও এসব ক্ষেত্রে এখনো চূড়ান্ত সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আসক্তি ও বিষণ্নতার চিকিৎসাতেও সম্ভাবনা
ওরেক্সিনের আরেক গ্রাহক, প্রথম ধরনের গ্রাহকটি, মস্তিষ্কের পুরস্কার ও প্রেরণাব্যবস্থার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। তাই এখানেই বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু ধারণা তৈরি হয়েছে।

এই গ্রাহকের কার্যক্রম বন্ধ করে মাদক বা অন্য আসক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। আবার উল্টোভাবে এর কার্যক্রম বাড়িয়ে মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থায় ওরেক্সিনের সংকেত জোরদার করা গেলে কিছু ধরনের বিষণ্নতা ও প্রেরণার ঘাটতিতে উপকার মিলতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এগুলোকে কার্যকর চিকিৎসায় রূপ দিতে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার প্রয়োজন।
জিএলপি-১-এর পর নতুন বিপ্লব?
ওষুধশিল্পের আগ্রহের কারণ শুধু নতুন একটি রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার নয়। জিএলপি-১ দেখিয়েছে, শরীরের একটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে তৈরি ওষুধ একাধিক রোগে অপ্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হতে পারে।
ক্ষুধা ও ঘুম—দুটিই শরীরের ভারসাম্য রক্ষার মৌলিক ব্যবস্থা। এগুলোর নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিলে একাধিক ধরনের অসুস্থতা তৈরি হতে পারে। তাই একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ঠিক করার মাধ্যমে একই সঙ্গে বহু রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
জিএলপি-১ যেমন ক্ষুধা ও বিপাকের চিকিৎসাকে নতুন পথে নিয়ে গেছে, তেমনি ওরেক্সিন হয়তো ঘুম, জাগরণ, মনোযোগ, প্রেরণা ও আসক্তির চিকিৎসায় নতুন দরজা খুলতে পারে।
তবে সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। নারকোলেপসির ক্ষেত্রে নতুন ওষুধ ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখালেও বিষণ্নতা, আসক্তি বা মনোযোগের সমস্যার ক্ষেত্রে সাফল্য এখনো গবেষণার বিষয়। সামনে বড় পরীক্ষাগুলোই নির্ধারণ করবে, ওরেক্সিন সত্যিই জিএলপি-১-এর মতো আরেকটি বহুমুখী চিকিৎসাবিপ্লব ঘটাতে পারে কি না।
মস্তিষ্কের জটিল জাগরণব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ওরেক্সিনভিত্তিক ওষুধের এই যাত্রা তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে নজরকাড়া নতুন অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















