যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় বাস্কেটবল দলগুলোর একটি লস অ্যাঞ্জেলেস লেকার্স বিক্রি হয়েছে ১২৫০ কোটি ডলারে। ১২ আগস্ট ঘোষিত এই চুক্তি শুধু একটি ক্রীড়া দলের মালিকানা বদলের ঘটনা নয়; বরং ক্রীড়া ব্যবসায় বিপুল পুঁজির আগ্রহ কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে, তারও এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত।
থ্রাইভ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা জোশুয়া কুশনার দলটির নিয়ন্ত্রণকারী মালিক হতে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ওয়াল্ট ডিজনির সাবেক প্রধান নির্বাহী বব আইগার। চুক্তিটি অনুমোদিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ক্রীড়া দলের জন্য এটিই হবে সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য।
আরও বিস্ময়কর হলো, লেকার্সের বর্তমান মালিক মার্ক ওয়াল্টার প্রায় এক বছর আগে দলটির জন্য যে অর্থ ব্যয় করেছিলেন, নতুন চুক্তির মূল্য তার চেয়ে প্রায় ২৫০ কোটি ডলার বেশি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দলের মূল্যায়নে এমন লাফ ক্রীড়া বিনিয়োগের বাজারে তৈরি হওয়া উন্মাদনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন লেকার্স এত মূল্যবান
লেকার্স শুধু একটি বাস্কেটবল দল নয়; এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত একটি ক্রীড়া ব্র্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো বাস্কেটবল দল স্থানীয় সম্প্রচারস্বত্ব থেকে লেকার্সের কাছাকাছি আয় করতে পারে না। আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও সমর্থকসংখ্যার ক্ষেত্রেও দলটি প্রায় অতুলনীয়।

লেকার্সের মূল্য তাই শুধু মাঠের সাফল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। দলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের ইতিহাস, তারকাখ্যাতি, বিপুল দর্শকগোষ্ঠী এবং বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক আবেদন। বিনিয়োগকারীদের কাছে এমন সম্পদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—সময় যত গড়ায়, তার পরিচিতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বাস্কেটবল কেন বিনিয়োগকারীদের টানছে
বাস্কেটবল নিজেও বিনিয়োগের জন্য ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালে জাতীয় বাস্কেটবল সংস্থা বিভিন্ন সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১১ বছরের জন্য ৭৬০০ কোটি ডলারের সম্প্রচারস্বত্ব চুক্তি করে। এর ফলে আগামী বহু বছরের আয় সম্পর্কে দলগুলোর জন্য একটি বড় ধরনের নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই খেলার দর্শকগোষ্ঠীর বড় অংশ তরুণ। ম্যাচে দ্রুত গতি, বেশি পয়েন্ট এবং নাটকীয়তার কারণে দর্শকদের আগ্রহও প্রবল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা। আগামী বছর ইউরোপে ১৬ দলের একটি নতুন প্রতিযোগিতা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে উত্তর আমেরিকার সীমানা ছাড়িয়ে বাস্কেটবলের বাজার আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হঠাৎ লেকার্সের দিকে কেন ঝুঁকলেন কুশনার
কুশনারের লেকার্স কেনার সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক হিসাবও রয়েছে। এর আগে তিনি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাণিজ্যিক শাখায় প্রায় ৪২০ কোটি ডলার বিনিয়োগের নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক বিক্রি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
এরপর কুশনার ও আইগার লাস ভেগাসে নতুন একটি বাস্কেটবল দল গঠনের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে সরাসরি লেকার্স কেনার পথে হাঁটেন। তাঁদের বিনিয়োগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল, যার লক্ষ্য এমন ব্যবসায় অর্থ ঢালা, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ঐতিহ্যবাহী, বিশ্বব্যাপী পরিচিত ক্রীড়া দল তাঁদের কাছে আকর্ষণীয় সম্পদ হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে দাম কি অতিরিক্ত চড়া?
প্রশ্নটি এখানেই। লেকার্সের অনন্য পরিচিতি নিয়ে সন্দেহের খুব বেশি অবকাশ নেই, কিন্তু ১২৫০ কোটি ডলারের মূল্যায়ন অনেক বিনিয়োগকারীর কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরেক শীর্ষস্থানীয় বাস্কেটবল দল বোস্টন সেলটিকসের জন্য বিনিয়োগকারীদের একটি দল যে অর্থ দিয়েছিল, লেকার্সের নতুন মূল্যায়ন তার দ্বিগুণেরও বেশি। অথচ লেকার্স কেনার ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র যুদ্ধও হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে না।
অর্থাৎ কুশনার যে দামে দলটি কিনছেন, তাতে ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর অত্যন্ত আশাবাদী হিসাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ক্রীড়া বিনিয়োগের বাজার যদি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তাহলে এমন মূল্যায়ন ভবিষ্যতে স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি সেই প্রত্যাশা পূরণ না হয়, তাহলে বিপুল অর্থ দিয়ে কেনা এই সম্পদই বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
বিক্রেতা কেন এত দ্রুত বিক্রি করলেন
আরেকটি প্রশ্ন উঠছে মার্ক ওয়াল্টারকে ঘিরে। মাত্র এক বছর আগে রেকর্ড দামে লেকার্স কেনার পর এত দ্রুত দলটি বিক্রি করার প্রয়োজন কেন হলো, তা স্পষ্ট নয়।
ওয়াল্টার লস অ্যাঞ্জেলেস ডজার্স নামের একটি বেসবল দলের নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারিত্ব ধরে রাখবেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি বড় ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে তাঁর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে।
তবে তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠান টিডব্লিউজি গ্লোবাল অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে খবর রয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি যে ঋণ পেয়েছিল, সেগুলো ওয়াল্টারের মালিকানাধীন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে কীভাবে দেখানো হয়েছিল, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের নজরদারি রয়েছে বলেও জানা গেছে। তাঁর শারীরিক অসুস্থতার কথাও শোনা যাচ্ছে।
ফলে লেকার্স বিক্রি হয়তো নিছক ব্যবসায়িক মুনাফা নেওয়ার সিদ্ধান্ত, আবার দ্রুত নগদ অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন থেকেও এমন পদক্ষেপ হয়ে থাকতে পারে।
ক্রীড়া এখন আর শুধু খেলা নয়
লেকার্সের এই বিপুল দামের বিক্রি একটি বড় পরিবর্তনের প্রতীক। একসময় ক্রীড়া দলকে আবেগ, ঐতিহ্য ও বিনোদনের সম্পদ হিসেবে দেখা হতো। এখন সেগুলো ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য বাড়ছে, তরুণ দর্শকের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দলগুলোর পরিচিতিকে সীমান্তের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে এবং ক্রীড়া ব্র্যান্ডগুলো নানা ধরনের বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করছে। ফলে বিপুল পুঁজি এখন এমন সম্পদের পেছনে ছুটছে, যার সরবরাহ সীমিত কিন্তু চাহিদা প্রায় সীমাহীন।
লেকার্সের ১২৫০ কোটি ডলারের বিক্রি তাই শুধু একটি দলের নতুন মালিক পাওয়ার গল্প নয়। এটি এমন এক বাজারের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্রীড়া আর কেবল খেলা নয়—এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী প্রভাব, পরিচিতি ও ভবিষ্যৎ আয়ের এক দুর্লভ সম্পদ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















