জাপানের মুদ্রা ইয়েনকে ঘিরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহন-বাণিজ্যের অবস্থান এখন ধীরে ধীরে ছোট করে আনছে দেশটির সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইয়েন কেনার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ শুধু মুদ্রার দর সামলানোর চেষ্টা নয়, বরং জাপানের সরকারি আর্থিক কাঠামোকে ভবিষ্যতের উচ্চ সুদের ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষিত করার কৌশলও হতে পারে।
ইয়েন দুর্বল, জাপানের বড় পদক্ষেপ
জুলাইয়ের শেষ দিকে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ১৬৩-এর নিচে নেমে যায়। ১৯৮৬ সালের পর এমন দুর্বল অবস্থান আর দেখা যায়নি। পরিস্থিতি সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মিলে ইয়েন কেনার উদ্যোগ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ ক্ষেত্রে বেশ সরাসরি অবস্থান নেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সহযোগিতাকে জাপানকে সামান্য সহায়তা হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তবে জাপান এমন কোনো দুর্বল পক্ষ নয়, যাকে শুধু বাইরের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বরং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে জাপান নিজেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খেলোয়াড়।

ইয়েন কিনে বিপুল মুনাফার সুযোগ
সাম্প্রতিক মুদ্রা বাজারের হস্তক্ষেপে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৯৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করে থাকতে পারে। সে সময় প্রায় ১৬০ ইয়েন দরে ডলার বিক্রি করে ইয়েন কেনা হয়।
জাপানের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের বড় অংশ এমন সময়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল, যখন এক ডলারের মূল্য ছিল ১০০ ইয়েনেরও কম। ফলে বর্তমান দরে ডলার বিক্রি করে ইয়েন কেনার মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ হিসাবনিকাশের মুনাফা ঘরে তুলতে পারে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই লেনদেন থেকে জাপান প্রায় ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ লাভ করে থাকতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহন-বাণিজ্যকারী
জাপানের আর্থিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লুকিয়ে আছে তার বিশাল বৈদেশিক সম্পদে। দেশটির সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারি পেনশন তহবিল মিলিয়ে বিদেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ দেশটির মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের ৫৬ শতাংশেরও বেশি।
দীর্ঘ ২৫ বছরে এসব বৈদেশিক সম্পদ গড়ে বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ আয় করেছে।
অন্যদিকে জাপানের সরকারি দায়ের বড় অংশ ইয়েনে এবং তুলনামূলক কম সুদে তৈরি। অর্থাৎ জাপান একদিকে বিদেশে তুলনামূলক বেশি আয় করা সম্পদ ধরে রেখেছে, অন্যদিকে নিজ দেশের মুদ্রায় অপেক্ষাকৃত কম সুদের দায় বহন করছে।
এই আয় ও ব্যয়ের ব্যবধানই বহন-বাণিজ্যের মূল সুবিধা।
ফলে জাপানের সরকারি খাতের বিপুল বৈদেশিক সম্পদ ও ইয়েনভিত্তিক দায় মিলিয়ে দেশটি কার্যত বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহন-বাণিজ্য বিনিয়োগকারীতে পরিণত হয়েছে।
এবার সেই সুবিধাই ঝুঁকিতে
সমস্যা হচ্ছে, জাপানের অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি স্থবির চাহিদা, মূল্যপতনের চাপ এবং দুর্বল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে লড়েছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অত্যন্ত নিচে রেখে ইয়েনকে দুর্বল অবস্থায় থাকতে দিয়েছে।
কিন্তু এখন মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাজারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন দফা সুদের হার বাড়াতে পারে।
সুদ বাড়লে সরকারি ব্যয়ও বাড়বে
সুদের হার বাড়লে জাপানের বিশাল সরকারি দায়ের ওপর চাপ দ্রুত বাড়বে। হিসাব অনুযায়ী, সুদের হার মোট ৭৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়লে সরকারি খাতের ঋণ ব্যয় দেশটির মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি দায়গুলো নতুন করে পুনঃঅর্থায়ন করতে গেলে এই চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ জাপানের এতদিনের কম সুদের ওপর নির্ভরশীল আর্থিক কাঠামো এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
ইয়েন কেনা মানে নিজের দায় কমানো
এই কারণেই সাম্প্রতিক মুদ্রা বাজারের হস্তক্ষেপকে শুধু ইয়েনের দর রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
জাপান ডলার বিক্রি করে ইয়েন কিনছে। এর ফলে এক অর্থে সরকার নিজের ইয়েনভিত্তিক দায়ের একটি অংশ পরিশোধ বা প্রত্যাহার করছে।
ইয়েন যতটা দুর্বল থাকবে, প্রতি ডলার বিক্রি করে তত বেশি ইয়েন কেনা সম্ভব। ফলে অপেক্ষাকৃত কম বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করেই বিপুল পরিমাণ ইয়েনভিত্তিক দায় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এ কারণে ইয়েনের প্রতিটি প্রতিরক্ষা জাপানের বিশাল বহন-বাণিজ্যের আকারকে সামান্য হলেও ছোট করছে।
হিসাবটি আরও জটিল
পুরো প্রক্রিয়াটি সরল নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করে, তখন সেই ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা ইয়েনের হিসাব কমে যায়। ফলে সরকারি খাতের ওপর থাকা কিছু ইয়েন দায়ও কমে।
তবে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয় না। মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপের প্রভাব সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত সরকারি ঋণপত্র কিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ইয়েনের জোগান আবার বাড়িয়ে দেয়।
তারপরও সামগ্রিক হিসাবে সরকারি খাতের সুদবহনকারী ইয়েন দায় কিছুটা কমে যায়।
বিশাল সমস্যার ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমাধান
তবে এই কৌশল জাপানের আর্থিক ঝুঁকি দূর করে না। যদি গত মাসের ৯৫ বিলিয়ন ডলারের হস্তক্ষেপের হিসাব সঠিক হয়, তবুও তা জাপানের সুদবহনকারী সরকারি দায়ের ১ শতাংশেরও কম কমিয়েছে।
কিন্তু সময়ের বিচারে পদক্ষেপটি গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে ইয়েন এখনও তুলনামূলক সস্তা। অন্যদিকে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা সামনে রয়েছে। তাই এখন বৈদেশিক সম্পদ বিক্রি করে ইয়েন কেনা জাপানের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করছে।
‘ইয়েন কিনুন’ নির্দেশনা আরও দীর্ঘ হতে পারে
মুদ্রা বাজার এখনও ইয়েনের শক্তিশালী পুনরুদ্ধার নিয়ে খুব বেশি নিশ্চিত নয়। ফলে সামনে ইয়েনকে সমর্থন করার আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকুক বা না থাকুক, জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার হয়তো আরও কয়েকবার একই কৌশল ব্যবহার করবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহন-বাণিজ্যকারী এখন ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান ছাঁটাই করছে। আর সেই প্রক্রিয়ায় ইয়েন কেনার নির্দেশনা জাপানের সরকারি কাজের তালিকায় আরও অনেক দিন থেকে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















