বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের পরিচিতি বহু পুরোনো। আন্তর্জাতিক অর্থের নিরাপদ আশ্রয়, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, পণ্যবাণিজ্য, সামুদ্রিক অর্থায়ন ও বিশেষায়িত বিমা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেশটির অবস্থান শক্তিশালী। কিন্তু এতসব সাফল্যের মাঝেও একটি বড় ঘাটতি ছিল। সিঙ্গাপুরের নিজস্ব শেয়ারবাজার এখনো সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি, যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তার অন্যান্য আর্থিক খাত।
সিঙ্গাপুর সরকার এখন সেই চিত্র বদলাতে মরিয়া। লক্ষ্য একটাই—দেশের শেয়ারবাজারকে আরও গভীর, সক্রিয় ও আকর্ষণীয় করে তোলা, যাতে বড় দেশীয় ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরেই পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হয়।
দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটছে
সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কম মূল্যায়ন ও কম লেনদেন। ফলে বহু প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের বাজার থেকে বিদায় নিয়েছে, অথচ নতুন প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে তুলনামূলক কম।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোম্পানিগুলোর জন্য আঞ্চলিক আর্থিক দরজা হিসেবে সিঙ্গাপুরের ব্যাপক পরিচিতি থাকলেও বাস্তবে তার সুবিধা খুব বেশি কাজে লাগেনি। আঞ্চলিক বহু প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের বদলে হংকংয়ের বাজারকে বেছে নিয়েছে। এমনকি সিঙ্গাপুরের সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই নিজেদের শেয়ার অন্য দেশের বাজারে তুলেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।

২০২৪ সালের শুরু থেকে সিঙ্গাপুরের প্রধান শেয়ারসূচক প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে হংকংয়ের প্রধান শেয়ারসূচকের উত্থান ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় সারির বড় কোম্পানিগুলোর সূচকও গত এক বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে।
ব্যাংক ও কোম্পানির সাফল্যে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা
সিঙ্গাপুরের শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর আয় বৃদ্ধিও বাজারকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয়ের তুলনায় শেয়ারের মূল্য বেড়েছে। এর অর্থ, বিনিয়োগকারীরা এখন সিঙ্গাপুরের বড় কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আগের চেয়ে বেশি আশাবাদী।
প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির বাজারেও সেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। গত বছর সিঙ্গাপুরে কোম্পানিগুলো প্রায় ২০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। ২০১৯ সালের পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ। চলতি বছরও সেই গতি আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে প্রায় ১১০ কোটি ডলার সংগ্রহ হয়েছে।
সরকারের নীতিও এই পুনরুজ্জীবনের বড় কারণ।
অর্থ দিয়ে বাজারকে চাঙ্গা করার কৌশল
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যেখানে শেয়ারবাজার সংস্কারে কঠোর নিয়ম ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে, সিঙ্গাপুর সেখানে প্রণোদনার পথ বেছে নিয়েছে।
নতুন কোম্পানিকে কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। প্রকাশনা ও আর্থিক তথ্য প্রকাশের কিছু নিয়ম সহজ করা হয়েছে। দুর্বল কোম্পানির ওপর নজরদারির কিছু ব্যবস্থাও কমানো হয়েছে।
শেয়ারবাজার নিয়ে গবেষণা বাড়াতেও সরকার অর্থ দিচ্ছে। কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করলে প্রতি প্রতিবেদনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সরকারি সহায়তা পাচ্ছে। ফলে বাজার নিয়ে গবেষণার পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছয় হাজার পাঁচশ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার
সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজার পুনরুজ্জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হলো ইকুইটি মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৬৫০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলারের তহবিল রাখা হয়েছে।
ব্যবস্থাটি বেশ সরল। কোনো বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের শেয়ারে একটি সরকারি ডলারের সমপরিমাণ বা তার বেশি বেসরকারি অর্থ বিনিয়োগ করলে সরকারও অর্থ দেবে। এর উদ্দেশ্য শুধু বাজারে সরকারি অর্থ ঢালা নয়; বরং বাইরের বেসরকারি অর্থকে সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারে টেনে আনা।
ইতোমধ্যে নয়টি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪০০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার দেওয়া হয়েছে।
সরকারের আশা, এর ফলে শেয়ারের মূল্য বাড়বে, লেনদেন বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত আরও বেশি কোম্পানি সিঙ্গাপুরে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হবে। অর্থাৎ বাজারে এমন একটি ঘূর্ণন তৈরি হবে, যেখানে বেশি বিনিয়োগ নতুন তালিকাভুক্তি বাড়াবে, আর নতুন তালিকাভুক্তি আবার বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করবে।
বিনিয়োগ তহবিলে বাড়ছে সাধারণ মানুষের আগ্রহ

সরকারি অর্থ পাওয়ার যোগ্য হতে বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর-কেন্দ্রিক তহবিল চালু করছে। এর মধ্যে বড় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
একটি স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের নতুন তহবিলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার থেকে বেড়ে ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
এর প্রভাব শেয়ারবাজারের লেনদেনেও দেখা যাচ্ছে। এই বিশেষ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে প্রধান শেয়ারসূচকের দৈনিক গড় লেনদেন অর্ধেকের বেশি বেড়েছে।
এখন প্রায় ৫০টি কোম্পানি তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বড় তালিকাভুক্তির আশায় সিঙ্গাপুর
চলতি বছরের শেষ দিকে একটি বড় তথ্যকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। এটি সম্পত্তি বিনিয়োগভিত্তিক একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে বাজারে আসতে পারে।
এমন বড় তালিকাভুক্তির সম্ভাবনাকে সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং খাতও ইতিবাচকভাবে দেখছে। বহু বছরের অভিজ্ঞতা থাকা এক ব্যাংকারের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে তালিকাভুক্তির সম্ভাব্য তালিকা এত শক্তিশালী আগে খুব কমই দেখা গেছে।
পেনশন তহবিল হতে পারে গেমচেঞ্জার
তবে সিঙ্গাপুর সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা এখনো সামনে।
২০২৮ সাল থেকে দেশটির প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের বাধ্যতামূলক অবসর সঞ্চয় ব্যবস্থায় নতুন ধরনের জীবনচক্রভিত্তিক বিনিয়োগ পণ্য চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পণ্যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগের ধরন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যাবে—প্রথম দিকে বেশি শেয়ারে, পরে ধীরে ধীরে বন্ডে।
বর্তমানে অবসর সঞ্চয়ের বড় অংশ সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। যদি নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই বিপুল সঞ্চয়ের একটি অংশ দেশীয় শেয়ারে প্রবাহিত হয়, তাহলে সিঙ্গাপুরের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার বিশাল অবসর তহবিল যেভাবে দেশটির শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করেছে, সিঙ্গাপুরেও তেমন একটি প্রভাব তৈরি হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে, এর ফলে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার নতুন করে দেশটির শেয়ারবাজারে প্রবেশ করতে পারে।
ঝুঁকিও কম নয়
তবে সিঙ্গাপুরের এই স্বপ্নের পথে বাধা এখনো রয়েছে। গত বছরের সবচেয়ে বড় তালিকাভুক্তির একটি ছিল জাপানের একটি বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের সমর্থিত তথ্যকেন্দ্রভিত্তিক সম্পত্তি বিনিয়োগ তহবিল। কিন্তু বাজারে আসার পর এর শেয়ারের দাম প্রস্তাবিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ নিচে নেমে গেছে।
চলতি বছরের নয়টি নতুন তালিকাভুক্তির মধ্যে মাত্র দুটি এখনো প্রাথমিক বিক্রয়মূল্যের ওপরে লেনদেন করছে।
এদিকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি বড় তথ্যকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান চলতি বছরের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। এই সিদ্ধান্তই দেখিয়ে দেয়, বড় কোম্পানিগুলোকে ঘরে রাখতে সিঙ্গাপুরের সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
শুধু সরকারি অর্থে বদলাবে না বাজার
সিঙ্গাপুরের নীতিনির্ধারকেরা বাজারকে চাঙ্গা করতে অনেক কিছু করতে পারেন—কর ছাড় দিতে পারেন, বিনিয়োগে প্রণোদনা দিতে পারেন, গবেষণায় অর্থ দিতে পারেন এবং অবসর সঞ্চয়ের অর্থকে শেয়ারের দিকে প্রবাহিত করতে পারেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি শেয়ারবাজারের শক্তি নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, কোম্পানির মূল্যায়ন, লেনদেনের গভীরতা এবং ভালো কোম্পানির ধারাবাহিক তালিকাভুক্তির ওপর।
সিঙ্গাপুর সরকার সেই ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হলো, সরকারি প্রণোদনার এই চাকা সত্যিই নিজস্ব গতিতে ঘুরতে শুরু করবে কি না।
সিঙ্গাপুরের স্বপ্ন শুধু বড় শেয়ারবাজার তৈরি করা নয়; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোম্পানিগুলোর জন্য নিজেদের শহরকেই প্রধান পুঁজিবাজারে পরিণত করা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অর্থ ঢালা হয়তো শুরুটা করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারের বিশ্বাসই ঠিক করবে সাফল্যের গল্প কতটা বড় হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















