প্রতি বছর ১৫ আগস্ট জাপানের আত্মসমর্পণের বার্ষিকী ঘিরে ইয়াসুকুনি শ্রাইন আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসে। কোন জাপানি রাজনীতিক সেখানে গেলেন, কে গেলেন না—এ নিয়েই তৈরি হয় কূটনৈতিক উত্তেজনা। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিবাদ জানায়, জাপানের যুদ্ধকালীন ভূমিকার সঙ্গে অতীতের হিসাব মেলানোর প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু এবারের ঘটনাপ্রবাহে আসল পরিবর্তন রাজনীতিকদের আচরণে নয়; বরং ইয়াসুকুনি শ্রাইনের নিজের অবস্থানে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইয়াসুকুনিকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক কেবল যুদ্ধস্মৃতি বা জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পূর্ব এশিয়ার কূটনৈতিক বাস্তবতা।
ইয়াসুকুনির ইতিহাসকে শুধু ‘যুদ্ধের মন্দির’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না
ইয়াসুকুনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৯ সালে, মেইজি পুনর্গঠনের পরপরই। তখন এর নাম ছিল শোকোন-শা—যুদ্ধে নিহতদের আত্মাকে স্মরণ করার স্থান। পরবর্তী সময়ে জাপানের বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতদের আত্মাকে এখানে নিবন্ধিত ও স্মরণ করা হয়।
ইয়াসুকুনি কোনো প্রচলিত কবরস্থান নয়। এখানে যাদের স্মরণ করা হয়, তাদের দেহাবশেষ রাখা নেই। বরং ধর্মীয় রীতিতে তাদের আত্মাকে নিবন্ধিত করে শ্রাইনের স্মৃতির অংশ করা হয়েছে। বোশিন যুদ্ধ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘাতে নিহত প্রায় ২৫ লাখ মানুষের আত্মা এখানে স্মরণ করা হয়। এর মধ্যে জাপানি সাম্রাজ্যের হয়ে যুদ্ধ করা কোরীয় ও তাইওয়ানিজরাও রয়েছেন।

যুদ্ধের মৃতদের নাম জাপান সরকার সরবরাহ করলেও কাদের ইয়াসুকুনিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকারের নয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ও শিন্তো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করার পর এই ক্ষমতা শ্রাইনের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে।
কখন থেকে ইয়াসুকুনি রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হলো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কয়েক দশকে ইয়াসুকুনিতে যুদ্ধাপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে শ্রাইনের ভেতরেও সতর্কতা ছিল। প্রধান পুরোহিত ফুজিমারো সুকুবা বিশেষ করে ‘ক্লাস এ’ যুদ্ধাপরাধীদের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন।
কিন্তু ১৯৭৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নতুন প্রধান পুরোহিত নাগায়োশি মাতসুদাইরা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ১৪ জন ‘ক্লাস এ’ যুদ্ধাপরাধীকে ইয়াসুকুনিতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইয়াসুকুনির প্রাঙ্গণে ইউশুকান জাদুঘরের পুনরায় চালু হওয়া। ১৯৮০-এর দশকে কার্যক্রম শুরু করা এই জাদুঘরের উপস্থাপনায় জাপানের ঔপনিবেশিক ও যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের অন্ধকার দিককে তুলনামূলকভাবে খাটো করে দেখানোর অভিযোগ ওঠে। ফলে ইয়াসুকুনি ধীরে ধীরে শুধু মৃতদের স্মৃতির স্থান না থেকে জাপানি জাতীয়তাবাদ ও সামরিকতাবাদ নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনে সরকারি ক্ষমতায় ইয়াসুকুনি সফর করলে চীনের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর যুদ্ধাপরাধীদের অন্যদের থেকে আলাদা করা বা তাদের শ্রাইনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। সরকারও আইনগতভাবে শ্রাইনের ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেনি।
ফলে নাকাসোনে শেষ পর্যন্ত সফর বন্ধ করেন। তাঁর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীদের বেশির ভাগই একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেন।
কোয়িজুমি থেকে আবের আমল: নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য
২০০০-এর দশকে জুনিচিরো কোয়িজুমি নিয়মিত ইয়াসুকুনি সফর শুরু করলে বিতর্ক আবার তীব্র হয়। এতে একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শ্রাইনের সরাসরি রাজনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীকালে শিনজো আবের দ্বিতীয় প্রশাসনের সময় ইয়াসুকুনিকে ঘিরে একটি নতুন রাজনৈতিক রীতি গড়ে ওঠে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আবের সরাসরি সফর বড় ধরনের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার পর টোকিও আরও সতর্ক অবস্থান নেয়।
এরপর থেকে প্রচলিত রীতি হলো—প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত ক্ষমতায় ইয়াসুকুনিতে অর্থ বা উপহার পাঠাবেন, কিন্তু নিজে সেখানে যাবেন না। মন্ত্রিসভার সদস্যদের সফরের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ রাখা হয়, যদিও প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের ক্ষেত্রে সংযম দেখা যায়। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ আইনপ্রণেতাদের ওপরও কার্যত তেমন নিষেধাজ্ঞা নেই।
অন্যদিকে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিক্রিয়াও এক ধরনের নিয়মিত কূটনৈতিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। ইয়াসুকুনিতে সফর হলেই প্রতিবাদ, বিবৃতি এবং কূটনৈতিক বার্তা—এ যেন পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
এবারের আসল পরিবর্তন রাজনীতিকদের মধ্যে নয়
২০২৬ সালের ১৫ আগস্টও মোটামুটি সেই পরিচিত কাঠামোই অনুসরণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইয়াসুকুনিতে উপহার পাঠিয়েছেন, কিন্তু সরাসরি সেখানে যাননি। তিনি বাইরে থেকে শ্রাইনের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করেছেন।
_1780209312.jpg)
প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোয়িজুমি অবশ্য ইয়াসুকুনিতে গেছেন। তাঁর বাবা জুনিচিরো কোয়িজুমির সময় থেকেই ১৫ আগস্টের এই সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এমন সফর একেবারে নজিরবিহীনও নয়।
অর্থাৎ রাজনীতিকদের আচরণে বড় কোনো বিচ্যুতি ঘটেনি। কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াও মূলত পরিচিত কাঠামোর মধ্যেই ছিল।
অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এসেছে অন্য জায়গা থেকে—ইয়াসুকুনি শ্রাইনের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।
সামরিক পোশাকে নিষেধাজ্ঞা কেন গুরুত্বপূর্ণ
১৫ আগস্টের স্মরণ অনুষ্ঠানের আগে ইয়াসুকুনি কর্তৃপক্ষ নতুন একটি নিয়ম ঘোষণা করে। শ্রাইনের ভেতরে ‘কসপ্লে পোশাক’ এবং সামরিক পোশাক বা সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়।
পরে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে, এই নিষেধাজ্ঞা সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সামরিক সদস্যদের সরকারি পোশাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো কাউকে প্রার্থনা থেকে বিরত রাখা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ বজায় রাখা, যেখানে সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
এই সিদ্ধান্তে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নাম নেওয়া হয়নি। কিন্তু এর তাৎপর্য স্পষ্ট। ইয়াসুকুনির কর্তৃপক্ষ সম্ভবত বুঝতে পারছে, শ্রাইনের ভেতরে সামরিকতাবাদী বা অতিরাষ্ট্রবাদী প্রদর্শন তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এখানেই এবারের ঘটনাটির রাজনৈতিক গুরুত্ব।
ইয়াসুকুনি বিতর্কের সমাধান কি শ্রাইনের ভেতর থেকেই আসতে পারে?
ইয়াসুকুনিকে ঘিরে বিতর্ককে এতদিন প্রধানত জাপান সরকার বনাম প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, শ্রাইনের নিজস্ব কর্তৃপক্ষও এই বিতর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে যুদ্ধাপরাধীদের অন্তর্ভুক্তি এবং ইউশুকান জাদুঘরের ভূমিকা ইয়াসুকুনির রাজনৈতিক চরিত্রকে আরও তীব্র করেছিল। এখন সামরিক পোশাক ও জাতীয়তাবাদী প্রদর্শন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত সেই একই কর্তৃপক্ষের ভিন্ন ধরনের ভূমিকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এটি কোনো বড় নীতিগত বিপ্লব নয়। এতে যুদ্ধাপরাধীদের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন বদলায়নি, জাপানের যুদ্ধস্মৃতি নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর আপত্তিও শেষ হয়নি। তবে এটি দেখাচ্ছে, ইয়াসুকুনি কর্তৃপক্ষ অন্তত তার প্রাঙ্গণকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা সামরিকতাবাদী প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হতে দিতে চাইছে না।
এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু এবারের ১৫ আগস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত কূটনৈতিক প্রতিবাদের পুনরাবৃত্তিতে নয়। বরং যে প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে, সেই প্রতিষ্ঠান নিজেই তার জনসম্মুখের চেহারা নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে—এটাই বড় বিষয়।
ইয়াসুকুনির ভবিষ্যৎ রাজনীতি তাই শুধু জাপানের প্রধানমন্ত্রী কে সেখানে গেলেন, তার ওপর নির্ভর করবে না। শ্রাইনের কর্তৃপক্ষ অতীতের বিতর্কিত উত্তরাধিকারকে কীভাবে পরিচালনা করে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের আচরণকে অনুমোদন দেয়, সেটিও পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধস্মৃতি ও জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মাইকেল ম্যাকআর্থার বোস্যাক 



















