০৮:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
সাইনসবুরির দোকানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল শনাক্তকরণ, বন্ধ হলো মুখ স্ক্যান ব্যবস্থা খরা মোকাবিলার জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশে ব্রিটিশ সরকারের ‘নিরাপত্তা’ যুক্তি, বাড়ছে উদ্বেগ ‘হিরোস’ ও ‘ন্যাশভিল’-খ্যাত অভিনেত্রী হেইডেন প্যানেটিয়েরে ৩৬ বছর বয়সে মারা গেছেন ইউরোভিশন ২০২৭: রাজধানী সোফিয়াকে হারিয়ে আয়োজক হচ্ছে কৃষ্ণসাগরের শহর বুর্গাস ভ্রমণে হালকা ব্যাগ? না, বরং বেশি করে সঙ্গে নিন! আফগান নারীদের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু অধিকার রক্ষা নয়, ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখা হোয়াইট হাউসের বিশাল বলরুম নির্মাণে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি চাইলেন ট্রাম্প ইরান চুক্তির পথে বাধা দিলে ওমানে বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পের এআইয়ের দৌড়ে জৈব অস্ত্রের ভয়: বিপদ আসার আগেই বিশ্বকে কেন প্রস্তুত হতে হবে ঋষভ পন্তের বিশ্বরেকর্ড, টেস্টে দ্রুততম ১০০ ছক্কার মাইলফলক

নিজের মতো করে সিনেমার পুরোনো ঘরানা বদলাচ্ছেন দুই নারী নির্মাতা

সিনেমার বহু পরিচিত গল্প ও ঘরানা দীর্ঘদিন ধরে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। তবে সেই চেনা কাঠামোকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা, বন্ধুত্ব ও জীবনবোধ দিয়ে নতুনভাবে সাজাচ্ছেন নির্মাতা শাতারা মিশেল ফোর্ড ও ডিলান মেয়ার। তাঁদের নতুন দুই চলচ্চিত্রে পুরোনো গল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছে নারীর নিজস্বতা, বন্ধুত্ব, পরিচয় ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।

পথের গল্প, তবে একেবারে অন্যভাবে

শাতারা মিশেল ফোর্ডের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ড্রিমস ইন নাইটমেয়ার্স’কে শুধু পথভ্রমণের চলচ্চিত্র হিসেবে দেখাতে চান না নির্মাতা। তাঁর মতে, এটি অবশ্যই পথভ্রমণের গল্প, তবে এমন এক নতুন ধরনের গল্প, যেখানে বহু পুরোনো ধারণাকে উল্টে দেওয়া হয়েছে।

চলচ্চিত্রটিতে তিন দীর্ঘদিনের সমকামী নারী বন্ধু তাদের চতুর্থ বন্ধুকে খুঁজতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে যাত্রা শুরু করে তারা নিউইয়র্ক, পিটসবার্গ, আইওয়া সিটি, কানসাস সিটি হয়ে শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর ওহাকায় পৌঁছায়।

তিন বন্ধুর প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে অনিশ্চয়তা। কেউ চাকরি হারিয়েছে, কেউ নিজের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায়, আবার কেউ কবিতা লিখলেও জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। বন্ধুকে খুঁজতে বের হলেও ধীরে ধীরে তারা নিজেদের জীবন ও সম্পর্ককেও নতুন করে আবিষ্কার করে।

ফোর্ড বলেন, সাধারণ হলিউডধর্মী কোনো গল্পের কাঠামো মাথায় রেখে তিনি কাজ করেন এবং তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে সেটিকে ভেঙে দেন। তাঁর চলচ্চিত্রও সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

গাড়ি মানেই স্বাধীনতা নয়, সম্পর্কের সেতু

আমেরিকার পথভ্রমণের চলচ্চিত্রে গাড়ি প্রায়ই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নেওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু ফোর্ডের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

শৈশবে সেন্ট লুইসে বেড়ে ওঠা এই নির্মাতা পরিবারের দূরের আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে নিয়মিত চার থেকে ছয় ঘণ্টা গাড়িতে ভ্রমণ করতেন। তাঁর কাছে গাড়ি মানে ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ, একা হয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা নয়।

এই অভিজ্ঞতাই তাঁর চলচ্চিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়েছে। এখানে মূল প্রশ্ন কোনো গন্তব্য জয় করা নয়। বরং দূরত্ব ও সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব কীভাবে বদলে যায়, কে জীবনে কতটা এগিয়ে যায় এবং সম্পর্কের মানুষগুলো একে অন্যকে কীভাবে নতুনভাবে চিনতে শেখে—সেই বিষয়গুলোই গুরুত্বপূর্ণ।

ফোর্ড এটিকে নিজের ‘মধ্যজীবনের সংকটের চলচ্চিত্র’ হিসেবেও দেখেন। তাঁর মতে, কোনো কিছু খুঁজতে আমরা যখন অনেক দূর যাই, তখন শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই খুঁজে পাই।

কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবনও ছড়িয়ে আছে সর্বত্র

চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলকে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার প্রচলিত ধারণা ভেঙে দেওয়া।

ফোর্ডের মতে, পথভ্রমণের চলচ্চিত্রে অনেক সময় এমন একটি ধারণা থাকে যে মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ নেই, অথবা সেখানে তাদের জীবনযাপন খুব কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা সর্বত্রই আছে।

চলচ্চিত্রের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ঐতিহাসিক বৃহৎ অভিবাসনের পুরোনো দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান সময়ের যাত্রাকে আরও দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

তবে চলচ্চিত্রটি কৃষ্ণাঙ্গ ও সমকামী মানুষের জীবনের ভয় বা সংকটকে অস্বীকার করে না। বরং সেই বাস্তবতার মধ্যেও বন্ধুত্ব, আনন্দ, আশা এবং সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করে।

বিশেষ করে নিখোঁজ চরিত্র কেলকে ঘিরে প্রচলিত দুঃখজনক গল্পের পথে হাঁটেননি নির্মাতা। ফোর্ড জানান, অনেকেই গল্পটি শুনে ধরে নিয়েছিলেন কেল হয়তো মারা গেছে। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করেই সেই পরিচিত পরিণতি এড়িয়ে গেছেন। তাঁর কাছে এটি আরেকজন রূপান্তরকামী নারীর অকালমৃত্যুর গল্প নয়।

এবার মেয়েদের দৃষ্টিতে উল্টে যাচ্ছে বিপথগামী বন্ধুত্বের গল্প

অন্যদিকে ডিলান মেয়ার তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘দ্য রং গার্লস’-এ এমন দুই নারীর গল্প বলেছেন, যাদের আচরণ প্রচলিত নারী চরিত্রের ছাঁচে ফেলা যায় না।

চলচ্চিত্রের দুই প্রধান চরিত্র ফ্র্যাঙ্কি ও মলি। তারা উদ্দেশ্যহীনভাবে দিন কাটানো দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ঘটনাচক্রে তারা পরীক্ষামূলক ওষুধভর্তি একটি ব্যাগ চুরি করে ফেলে। এরপর শুরু হয় মাদক, অপরাধী, অদ্ভুত পরিস্থিতি ও নানা হাস্যকর ঘটনার এক বিশৃঙ্খল যাত্রা।

গল্পটিতে কথা বলা বিড়াল, নেদারল্যান্ডসের অপরাধী এবং টেলিপ্যাথির মতো অস্বাভাবিক উপাদানও রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এবার পুরুষ নয়, নারী।

মেয়ার চাননি এটি পুরুষদের নিয়ে তৈরি পুরোনো হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্রের আদলে বানানো কোনো ‘মেয়েদের সংস্করণ’ হয়ে উঠুক। বরং নিজের জীবনের একটি সম্পর্ক থেকেই গল্পের মূল আবেগ তৈরি করেছেন তিনি।

15 Women Directors Making Contemporary Film Better Than Ever :: Kino Film  Collection

মেয়েদের দুষ্টুমি নিয়েও গল্প হতে পারে

মেয়ার প্রায় এক দশক ধরে ‘দ্য রং গার্লস’ নিয়ে কাজ করেছেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে তাঁর ধারণা হয়েছিল, হয়তো অন্য কেউ এর আগে এমন গল্প বানিয়ে ফেলবেন।

তবে তাঁর মতে, মেয়েদের বেপরোয়া, বিশৃঙ্খল বা প্রচলিত সামাজিক নিয়মের বাইরে থাকা আচরণকে সমাজ পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি কঠিনভাবে বিচার করে। পুরুষ বন্ধুদের বিপদে জড়িয়ে পড়ার গল্পে সিনেমার পর্দা ভরা থাকলেও নারীদের বন্ধুত্ব ও দুষ্টুমি তুলনামূলকভাবে কম জায়গা পেয়েছে।

মেয়ার নিজেও পুরোনো সময়ের মাদককেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে থাকা নারীদের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পাননি। সেখানে নারী চরিত্র হয় পুরুষের সহনশীল প্রেমিকা, নয়তো একমাত্র কর্মজীবী নারী, যে পুরুষদের আনন্দ-উল্লাস দেখে বিরক্ত হয়।

তাই তিনি এমন এক নারীসমাজ দেখাতে চেয়েছেন, যারা সত্যিই নিজেদের মতো করে জীবন কাটায় এবং সংখ্যায়ও কম নয়।

ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব থেকেই চলচ্চিত্রের জন্ম

‘দ্য রং গার্লস’ আংশিকভাবে মেয়ার ও তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ম্যাগি ম্যাকলিনের বন্ধুত্ব থেকে তৈরি। ম্যাকলিন চলচ্চিত্রটির প্রযোজকদের একজনও।

মেয়ার এই গল্পকে বাস্তব জীবনের বিশৃঙ্খলা ও সততাকে একটি চলচ্চিত্রধর্মী কাঠামোর মধ্য দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা হিসেবে দেখেছেন।

চরিত্র দুটির পোশাক ও চেহারাতেও কোনো প্রতিষ্ঠিত নারীকেন্দ্রিক ছাঁচ অনুসরণ করা হয়নি। পুরোনো পোশাক, লস অ্যাঞ্জেলেসের নানা স্মারক এবং বিচিত্র নকশার পোশাক ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব একটি জগৎ তৈরি করা হয়েছে।

সাফল্যের সংজ্ঞাও বদলে দিচ্ছেন মেয়ার

চলচ্চিত্রের শেষদিকে মেয়ার প্রচলিত ‘নারীকে সফল হতেই হবে’ ধরনের গল্পকেও প্রশ্ন করেছেন।

আজকের সমাজে ব্যক্তিগত সাফল্যকে অনেক সময় সাজানো কোনো অর্জনের মতো উপস্থাপন করা হয়। বিশেষ করে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠাকে প্রায়ই বড় কোনো বিজয়ের গল্প হিসেবে দেখানো হয়।

কিন্তু ফ্র্যাঙ্কি ও মলির ক্ষেত্রে পরিবর্তন খুব ছোট। তারা খুব বেশি পরিণত হয় না, জীবনের সব সমস্যাও সমাধান করে ফেলে না। শুধু সামান্য একটু বড় হয়, সামান্য একটু এগিয়ে যায়। আর সেটুকুতেই তারা সন্তুষ্ট।

একটি দৃশ্যে তারা দুই করপোরেট কর্মকর্তার সঙ্গে বেতন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উল্টো নিজেদের সম্ভাব্য আয় কমিয়ে ফেলে। অথচ বিষয়টি তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না। কারণ তাদের কাছে বিপুল অর্থ উপার্জনের চেয়ে নিজেদের মতো করে শান্তিতে জীবন কাটানো বেশি মূল্যবান।

মেয়েদের জন্য নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকারকেও মেয়ার এক ধরনের নারীবাদ হিসেবে দেখেছেন।

বন্ধুত্বের গুরুত্বও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে

ফোর্ডের ‘ড্রিমস ইন নাইটমেয়ার্স’-এর মধ্যেও রয়েছে একই ধরনের গভীর রাজনৈতিক ভাবনা। পর্যাপ্ত সময়, অর্থ ও মানসিক অবকাশ পেলে মানুষ কী করতে পারে—চলচ্চিত্রটি সেই প্রশ্ন তোলে।

আজকের ক্লান্ত ও সম্পদসংকটে ভোগা সমাজে নিজের জন্য সময় নেওয়া, অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা কিংবা সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে প্রচলিত সামাজিক কাঠামো যেখানে প্রেমের সম্পর্ককে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে দেখে, সেখানে ফোর্ড বন্ধুত্বের শক্তিকে সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, সমকামী মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় হয়ে ওঠে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাইনসবুরির দোকানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল শনাক্তকরণ, বন্ধ হলো মুখ স্ক্যান ব্যবস্থা

নিজের মতো করে সিনেমার পুরোনো ঘরানা বদলাচ্ছেন দুই নারী নির্মাতা

০৬:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

সিনেমার বহু পরিচিত গল্প ও ঘরানা দীর্ঘদিন ধরে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। তবে সেই চেনা কাঠামোকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা, বন্ধুত্ব ও জীবনবোধ দিয়ে নতুনভাবে সাজাচ্ছেন নির্মাতা শাতারা মিশেল ফোর্ড ও ডিলান মেয়ার। তাঁদের নতুন দুই চলচ্চিত্রে পুরোনো গল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছে নারীর নিজস্বতা, বন্ধুত্ব, পরিচয় ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।

পথের গল্প, তবে একেবারে অন্যভাবে

শাতারা মিশেল ফোর্ডের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ড্রিমস ইন নাইটমেয়ার্স’কে শুধু পথভ্রমণের চলচ্চিত্র হিসেবে দেখাতে চান না নির্মাতা। তাঁর মতে, এটি অবশ্যই পথভ্রমণের গল্প, তবে এমন এক নতুন ধরনের গল্প, যেখানে বহু পুরোনো ধারণাকে উল্টে দেওয়া হয়েছে।

চলচ্চিত্রটিতে তিন দীর্ঘদিনের সমকামী নারী বন্ধু তাদের চতুর্থ বন্ধুকে খুঁজতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে যাত্রা শুরু করে তারা নিউইয়র্ক, পিটসবার্গ, আইওয়া সিটি, কানসাস সিটি হয়ে শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর ওহাকায় পৌঁছায়।

তিন বন্ধুর প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে অনিশ্চয়তা। কেউ চাকরি হারিয়েছে, কেউ নিজের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায়, আবার কেউ কবিতা লিখলেও জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। বন্ধুকে খুঁজতে বের হলেও ধীরে ধীরে তারা নিজেদের জীবন ও সম্পর্ককেও নতুন করে আবিষ্কার করে।

ফোর্ড বলেন, সাধারণ হলিউডধর্মী কোনো গল্পের কাঠামো মাথায় রেখে তিনি কাজ করেন এবং তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে সেটিকে ভেঙে দেন। তাঁর চলচ্চিত্রও সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

গাড়ি মানেই স্বাধীনতা নয়, সম্পর্কের সেতু

আমেরিকার পথভ্রমণের চলচ্চিত্রে গাড়ি প্রায়ই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নেওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু ফোর্ডের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

শৈশবে সেন্ট লুইসে বেড়ে ওঠা এই নির্মাতা পরিবারের দূরের আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে নিয়মিত চার থেকে ছয় ঘণ্টা গাড়িতে ভ্রমণ করতেন। তাঁর কাছে গাড়ি মানে ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ, একা হয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা নয়।

এই অভিজ্ঞতাই তাঁর চলচ্চিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়েছে। এখানে মূল প্রশ্ন কোনো গন্তব্য জয় করা নয়। বরং দূরত্ব ও সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব কীভাবে বদলে যায়, কে জীবনে কতটা এগিয়ে যায় এবং সম্পর্কের মানুষগুলো একে অন্যকে কীভাবে নতুনভাবে চিনতে শেখে—সেই বিষয়গুলোই গুরুত্বপূর্ণ।

ফোর্ড এটিকে নিজের ‘মধ্যজীবনের সংকটের চলচ্চিত্র’ হিসেবেও দেখেন। তাঁর মতে, কোনো কিছু খুঁজতে আমরা যখন অনেক দূর যাই, তখন শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই খুঁজে পাই।

কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবনও ছড়িয়ে আছে সর্বত্র

চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলকে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার প্রচলিত ধারণা ভেঙে দেওয়া।

ফোর্ডের মতে, পথভ্রমণের চলচ্চিত্রে অনেক সময় এমন একটি ধারণা থাকে যে মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ নেই, অথবা সেখানে তাদের জীবনযাপন খুব কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা সর্বত্রই আছে।

চলচ্চিত্রের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ঐতিহাসিক বৃহৎ অভিবাসনের পুরোনো দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান সময়ের যাত্রাকে আরও দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

তবে চলচ্চিত্রটি কৃষ্ণাঙ্গ ও সমকামী মানুষের জীবনের ভয় বা সংকটকে অস্বীকার করে না। বরং সেই বাস্তবতার মধ্যেও বন্ধুত্ব, আনন্দ, আশা এবং সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করে।

বিশেষ করে নিখোঁজ চরিত্র কেলকে ঘিরে প্রচলিত দুঃখজনক গল্পের পথে হাঁটেননি নির্মাতা। ফোর্ড জানান, অনেকেই গল্পটি শুনে ধরে নিয়েছিলেন কেল হয়তো মারা গেছে। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করেই সেই পরিচিত পরিণতি এড়িয়ে গেছেন। তাঁর কাছে এটি আরেকজন রূপান্তরকামী নারীর অকালমৃত্যুর গল্প নয়।

এবার মেয়েদের দৃষ্টিতে উল্টে যাচ্ছে বিপথগামী বন্ধুত্বের গল্প

অন্যদিকে ডিলান মেয়ার তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘দ্য রং গার্লস’-এ এমন দুই নারীর গল্প বলেছেন, যাদের আচরণ প্রচলিত নারী চরিত্রের ছাঁচে ফেলা যায় না।

চলচ্চিত্রের দুই প্রধান চরিত্র ফ্র্যাঙ্কি ও মলি। তারা উদ্দেশ্যহীনভাবে দিন কাটানো দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ঘটনাচক্রে তারা পরীক্ষামূলক ওষুধভর্তি একটি ব্যাগ চুরি করে ফেলে। এরপর শুরু হয় মাদক, অপরাধী, অদ্ভুত পরিস্থিতি ও নানা হাস্যকর ঘটনার এক বিশৃঙ্খল যাত্রা।

গল্পটিতে কথা বলা বিড়াল, নেদারল্যান্ডসের অপরাধী এবং টেলিপ্যাথির মতো অস্বাভাবিক উপাদানও রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এবার পুরুষ নয়, নারী।

মেয়ার চাননি এটি পুরুষদের নিয়ে তৈরি পুরোনো হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্রের আদলে বানানো কোনো ‘মেয়েদের সংস্করণ’ হয়ে উঠুক। বরং নিজের জীবনের একটি সম্পর্ক থেকেই গল্পের মূল আবেগ তৈরি করেছেন তিনি।

15 Women Directors Making Contemporary Film Better Than Ever :: Kino Film  Collection

মেয়েদের দুষ্টুমি নিয়েও গল্প হতে পারে

মেয়ার প্রায় এক দশক ধরে ‘দ্য রং গার্লস’ নিয়ে কাজ করেছেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে তাঁর ধারণা হয়েছিল, হয়তো অন্য কেউ এর আগে এমন গল্প বানিয়ে ফেলবেন।

তবে তাঁর মতে, মেয়েদের বেপরোয়া, বিশৃঙ্খল বা প্রচলিত সামাজিক নিয়মের বাইরে থাকা আচরণকে সমাজ পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি কঠিনভাবে বিচার করে। পুরুষ বন্ধুদের বিপদে জড়িয়ে পড়ার গল্পে সিনেমার পর্দা ভরা থাকলেও নারীদের বন্ধুত্ব ও দুষ্টুমি তুলনামূলকভাবে কম জায়গা পেয়েছে।

মেয়ার নিজেও পুরোনো সময়ের মাদককেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে থাকা নারীদের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পাননি। সেখানে নারী চরিত্র হয় পুরুষের সহনশীল প্রেমিকা, নয়তো একমাত্র কর্মজীবী নারী, যে পুরুষদের আনন্দ-উল্লাস দেখে বিরক্ত হয়।

তাই তিনি এমন এক নারীসমাজ দেখাতে চেয়েছেন, যারা সত্যিই নিজেদের মতো করে জীবন কাটায় এবং সংখ্যায়ও কম নয়।

ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব থেকেই চলচ্চিত্রের জন্ম

‘দ্য রং গার্লস’ আংশিকভাবে মেয়ার ও তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ম্যাগি ম্যাকলিনের বন্ধুত্ব থেকে তৈরি। ম্যাকলিন চলচ্চিত্রটির প্রযোজকদের একজনও।

মেয়ার এই গল্পকে বাস্তব জীবনের বিশৃঙ্খলা ও সততাকে একটি চলচ্চিত্রধর্মী কাঠামোর মধ্য দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা হিসেবে দেখেছেন।

চরিত্র দুটির পোশাক ও চেহারাতেও কোনো প্রতিষ্ঠিত নারীকেন্দ্রিক ছাঁচ অনুসরণ করা হয়নি। পুরোনো পোশাক, লস অ্যাঞ্জেলেসের নানা স্মারক এবং বিচিত্র নকশার পোশাক ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব একটি জগৎ তৈরি করা হয়েছে।

সাফল্যের সংজ্ঞাও বদলে দিচ্ছেন মেয়ার

চলচ্চিত্রের শেষদিকে মেয়ার প্রচলিত ‘নারীকে সফল হতেই হবে’ ধরনের গল্পকেও প্রশ্ন করেছেন।

আজকের সমাজে ব্যক্তিগত সাফল্যকে অনেক সময় সাজানো কোনো অর্জনের মতো উপস্থাপন করা হয়। বিশেষ করে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠাকে প্রায়ই বড় কোনো বিজয়ের গল্প হিসেবে দেখানো হয়।

কিন্তু ফ্র্যাঙ্কি ও মলির ক্ষেত্রে পরিবর্তন খুব ছোট। তারা খুব বেশি পরিণত হয় না, জীবনের সব সমস্যাও সমাধান করে ফেলে না। শুধু সামান্য একটু বড় হয়, সামান্য একটু এগিয়ে যায়। আর সেটুকুতেই তারা সন্তুষ্ট।

একটি দৃশ্যে তারা দুই করপোরেট কর্মকর্তার সঙ্গে বেতন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উল্টো নিজেদের সম্ভাব্য আয় কমিয়ে ফেলে। অথচ বিষয়টি তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না। কারণ তাদের কাছে বিপুল অর্থ উপার্জনের চেয়ে নিজেদের মতো করে শান্তিতে জীবন কাটানো বেশি মূল্যবান।

মেয়েদের জন্য নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকারকেও মেয়ার এক ধরনের নারীবাদ হিসেবে দেখেছেন।

বন্ধুত্বের গুরুত্বও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে

ফোর্ডের ‘ড্রিমস ইন নাইটমেয়ার্স’-এর মধ্যেও রয়েছে একই ধরনের গভীর রাজনৈতিক ভাবনা। পর্যাপ্ত সময়, অর্থ ও মানসিক অবকাশ পেলে মানুষ কী করতে পারে—চলচ্চিত্রটি সেই প্রশ্ন তোলে।

আজকের ক্লান্ত ও সম্পদসংকটে ভোগা সমাজে নিজের জন্য সময় নেওয়া, অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা কিংবা সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে প্রচলিত সামাজিক কাঠামো যেখানে প্রেমের সম্পর্ককে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে দেখে, সেখানে ফোর্ড বন্ধুত্বের শক্তিকে সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, সমকামী মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় হয়ে ওঠে।