হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের সম্ভাব্য টোল বা সেবামূল্য আর শুধু একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে থাকছে না। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই প্রথা চালু হলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতেও একই ধরনের অর্থ আদায়ের দাবি উঠতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের দীর্ঘদিনের অবাধ চলাচলের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়বে, বাড়বে পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্বজুড়ে পণ্যের দামও আরও বেড়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য ইরান কোনো না কোনো ধরনের অর্থ আদায়ের কাঠামো চালুর দাবি জানিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রও এই দাবি ঠেকাতে ক্রমেই সীমিত সক্ষমতার মুখে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ভবিষ্যতে নিয়মিত অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা চালু হতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে।
এক প্রণালির সিদ্ধান্তে বদলে যেতে পারে বিশ্ব নৌবাণিজ্য
জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের নীতিমালা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিভাগের প্রধান মিশেল ব্রুহার্ডের মতে, সমুদ্রপথের অবাধ চলাচলের যে ধারণা এত দিন বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি ছিল, তা এখন কার্যত মৃত্যুর মুখে।
তার ভাষায়, এত দিন যে ধরনের সামুদ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা বিশ্ব দেখেছে, তা এখন নতুন যুগে প্রবেশ করছে। সেই নতুন ব্যবস্থার নিয়ম এখনো লেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতের এই ব্যবস্থা হবে ব্যয়বহুল এবং মূল্যস্ফীতিবর্ধক। একই সঙ্গে যেসব দেশ নিজেদের দেশে শিল্প উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে পারবে, তারা এতে লাভবানও হতে পারে।
সমুদ্রপথের অবাধ চলাচল বলতে শতাব্দী ধরে এমন একটি ধারণাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও যাতায়াত সব দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধের অবসান ও শান্তির ভিত্তি হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের বিখ্যাত চৌদ্দ দফা প্রস্তাবেও নৌপথে অবাধ চলাচলের অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। পরে এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনসংক্রান্ত জাতিসংঘের সনদে স্থান পায়।
ব্রুহার্ডের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাই এখন ভেঙে পড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর আঞ্চলিকতাবাদ এবং পশ্চিম গোলার্ধে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সেই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত এগিয়ে দিচ্ছে।
হরমুজের পর মালাক্কা ও জিব্রাল্টারেও কি টোল?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, হরমুজ প্রণালিতে যদি টোল চালু হয়, তাহলে অন্য দেশগুলোও নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে অর্থ আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
এশিয়ার মালাক্কা প্রণালি, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী জিব্রাল্টার প্রণালি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রভাবিত গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোও ভবিষ্যতে একই ধরনের অর্থ আদায়ের আওতায় আসতে পারে।
ব্রুহার্ডের যুক্তি, ইরান যদি একটি প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলের জন্য অর্থ দাবি করে এবং সেটি কার্যকর হয়, তাহলে অন্য দেশগুলোর কাছেও একই কাজ করার নজির তৈরি হবে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তুলনামূলকভাবে কম আয়ের দেশ হলেও মালাক্কা প্রণালির ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য টোল আদায়ের সুযোগ তাদের হাতে এলে তা বড় ধরনের নতুন আয়ের উৎসে পরিণত হতে পারে। একইভাবে জিব্রাল্টার প্রণালিকে ঘিরে মরক্কোও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
অর্থাৎ, আগে যেসব প্রাকৃতিক নৌপথ কোনো নির্দিষ্ট মূল্য ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হতো, সেগুলোই নতুন ধরনের বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।
ইরানের দাবিতে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা
ইরান প্রতি ব্যারেল তেলের ওপর পাঁচ থেকে সাত শতাংশ পর্যন্ত সেবামূল্য নেওয়ার দাবি করছে বলে জানা গেছে। এই অর্থ আদায় করা গেলে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে।
তবে এই হিসাব শুধু তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে। প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোরসায়নিক পণ্য, হিলিয়াম, সার এবং পণ্যবাহী জাহাজের অন্যান্য চালান থেকে অর্থ আদায় করা হলে মোট আয় আরও অনেক বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ অবশ্য এত বেশি হারে অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান। তারপরও হরমুজে কোনো না কোনো ধরনের অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত চালু হতে পারে—এমন ধারণা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে।
ইরানের দাবি কি আসলে দর-কষাকষির অস্ত্র?
সব বিশ্লেষক অবশ্য মনে করেন না যে ইরান দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের টোল চালু করবে।
জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের সাবেক হোয়াইট হাউস জ্বালানি উপদেষ্টা ও র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বব ম্যাকন্যালির মতে, হরমুজে টোলের দাবি মূলত ইরানের দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হতে পারে। নিষেধাজ্ঞা থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ছাড় এবং অন্যান্য সুবিধা পেলে ইরান তুলনামূলক ছোট ও স্বেচ্ছামূলক সেবামূল্যে রাজি হতে পারে।
ম্যাকন্যালির ধারণা, কঠোর ও বড় অঙ্কের ইরানি টোল ভবিষ্যতের স্থায়ী ব্যবস্থা নাও হতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এই ধারণা ভুলও প্রমাণিত হতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো সরাসরি প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বদলে ইরানকে নিয়মিত অর্থ দিতে পারে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা হতে পারে।
ইরান ও জ্বালানি বিষয়ে ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রুর মতে, কোনো না কোনোভাবে ইরানের হাতে অর্থ পৌঁছানোর সম্ভাবনাই বেশি। সেই অর্থ উপসাগরীয় দেশগুলো দিতে পারে এবং তা প্রণালি পরিচালনা ও নিরাপত্তার ব্যয় মেটানোর জন্য স্বেচ্ছামূলক অর্থ হিসেবে দেখানো হতে পারে।
তবে মালাক্কা প্রণালিতে বর্তমানে যে সামান্য স্বেচ্ছামূলক অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে, হরমুজের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে তুলনা করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। মালাক্কার তুলনা ব্যবহার করে হরমুজের অর্থ প্রদানের ব্যবস্থাকে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে। কিন্তু মূল পার্থক্য হবে অর্থের পরিমাণে। ইরান সামান্য অর্থে সন্তুষ্ট নাও হতে পারে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হতে পারে।

মালাক্কা প্রণালিও কি ঝুঁকিতে?
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া চলতি বছর মালাক্কা প্রণালিতে টোল চালুর সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করেছে। যদিও উভয় দেশই এখন পর্যন্ত জানিয়েছে, আপাতত তারা এমন ব্যবস্থা চালু করবে না।
তবে হরমুজে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে মালাক্কাকে ঘিরে সেই অবস্থান বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কারণ মালাক্কা প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ। এশিয়ার বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে চলাচল করে। সেখানে নতুন অর্থ আরোপ করা হলে তার প্রভাব শুধু জাহাজ কোম্পানি বা জ্বালানি আমদানিকারকদের ওপর পড়বে না; শেষ পর্যন্ত তা ভোক্তাদেরও বহন করতে হবে।
রাশিয়াকে শাস্তি দিতে বসফরাসে টোলের প্রস্তাব
ব্রুহার্ড আরও একটি বিতর্কিত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়াকে শাস্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল তুরস্কসহ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে বসফরাস প্রণালি দিয়ে রাশিয়ার জাহাজ চলাচলের ওপর অর্থ আরোপের ব্যবস্থা করা।
এর বদলে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রির দামের ওপর সীমা আরোপ করা হয়েছিল। ব্রুহার্ডের যুক্তি, রাশিয়ার তেলকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল তেলে পরিণত করলে রাশিয়া বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু তেলের দাম কমিয়ে রাখার ফলে শেষ পর্যন্ত চীনসহ তেল ক্রেতা দেশগুলোই সুবিধা পেয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেছেন, বসফরাসে এ ধরনের অর্থ আরোপ সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতো।
‘সমুদ্রের স্বাধীনতা’ কি এখন পুরোনো ধারণা?
ব্রুহার্ডের মতে, বর্তমান বৈরিতাপূর্ণ বিশ্বে সমুদ্রপথের অবাধ চলাচলের পুরোনো ধারণাটি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তার যুক্তি হলো, এমন একটি বিশ্বে যেখানে প্রায় সবাই পরস্পরের বন্ধু, সেখানে অবাধ সমুদ্র চলাচল অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে যখন বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাত বাড়ছে এবং চীনের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে, তখন সব দেশের জন্য একইভাবে অবাধ নৌচলাচল রাখা আদৌ কার্যকর কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিবর্তনের একটি বড় ফল হতে পারে শিল্প উৎপাদন নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা। দেশগুলো বিদেশি সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে ঝুঁকতে পারে।
কিন্তু এর বিনিময়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির মুখে পড়তে হবে।
শুধু তেল নয়, বাড়বে সব পণ্যের পরিবহন ব্যয়
সমুদ্রপথে টোল আরোপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
জাহাজে পরিবাহিত পণ্যের মধ্যে শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্বের বিপুল পরিমাণ খাদ্য, শিল্পপণ্য, কাঁচামাল, পোশাক, যন্ত্রপাতি এবং ভোক্তা পণ্যও রয়েছে। ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে টোল বসলে পণ্যবাহী জাহাজের খরচ বাড়বে এবং সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হবে।
ব্রুহার্ডের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে যে মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে, তার বড় অংশই পণ্যের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিগুলোতে টোল চালু হলে পণ্যবাহী জাহাজে পরিবহনের খরচ আরও বাড়বে।
বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। তাই এই পরিবর্তন শুধু কয়েকটি পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে না। এর প্রভাব পড়বে কার্যত পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর।
হরমুজ প্রণালিতে শুরু হওয়া একটি অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা তাই শেষ পর্যন্ত বিশ্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সমুদ্রপথের অবাধ চলাচলের শতাব্দীপ্রাচীন ধারণা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থার চাপ এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি—সবই নতুন মাত্রা পেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















