বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ এখন ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ হচ্ছে। এর ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন মেয়াদের ট্রেজারি বিলের সুদহার ২১ থেকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে। দীর্ঘ সময় পর এই সুদহার আবার ৯ শতাংশের নিচে নামল।
তিন মেয়াদেই সুদহার কমেছে
১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহারও এক সপ্তাহে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ হয়েছে। একইভাবে ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে।
ব্যাংকারদের মতে, ট্রেজারি বিলের সুদহার কমার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করছে। এর একটি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য থাকা এবং অন্যটি বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া। বিশেষ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে।
আমানত বাড়ছে, ঋণের চাহিদা কম

গত এক বছরে মে পর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর আমানত প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। আমানতের সুদহার বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য আমানতের সুদহার তুলনামূলক আকর্ষণীয় ছিল।
অন্যদিকে, ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত অর্থের বড় একটি অংশ বিনিয়োগের বিকল্প খুঁজছে। এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের তুলনামূলক লাভজনক ক্ষেত্র হিসেবে ট্রেজারি বিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।
ট্রেজারি বিলে বাড়ছে বিনিয়োগ
গত কয়েক মাসে বেশি আমানত পাওয়া দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এতে বিলের চাহিদা বেড়েছে এবং চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সুদহার কমেছে।
ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি বাড়ার পর আগস্ট থেকে শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যাংক আমানতের সুদহারও ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই বিনিয়োগ ছিল ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা।

ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানই বড় বিনিয়োগকারী
ব্যাংকাররা বলছেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মূলত ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারি এসব সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
২০২৩ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের ৯ শতাংশ সুদসীমা তুলে দিয়ে স্মার্টভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালু করে। এরপর ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একপর্যায়ে এসব সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
ওই সময়ে ব্যক্তি পর্যায়েও ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ দেখা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন মাসের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো সময়ে এসব সিকিউরিটিজের সুদহার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, আবার কোনো কোনো মাসে তা ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। একই সময়ে ব্যাংকভেদে আমানতের সুদহার ছিল ৯ থেকে ১১ শতাংশ।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় বর্তমানে ট্রেজারি বিলের প্রতি ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। তবে বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ার বিপরীতে সুদহার কমে যাওয়ায় সরকারি স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্রের বাজারে নতুন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















