কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার যত দ্রুত হচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তি বিশ্বের ক্ষমতার সমীকরণ। একসময় এনভিডিয়া এবং অ্যামাজন, গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো বিশাল মেঘভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক ছিল বেশ সরল। এনভিডিয়া তৈরি করত শক্তিশালী চিপ, আর এসব প্রতিষ্ঠান সেই চিপ কিনে বিশাল তথ্যকেন্দ্র গড়ে তুলত। কিন্তু সেই সম্পর্ক এখন ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে মোড় নিচ্ছে।
দুই পক্ষই এখনো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তবে ভবিষ্যতে এই নির্ভরতা কমিয়ে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে উভয়েই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো ঘিরে বিপুল বিনিয়োগ, নিজস্ব চিপ তৈরি এবং নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে প্রযুক্তি শিল্পে শুরু হয়েছে এক বড় পুনর্বিন্যাস।
এনভিডিয়ার নতুন অর্থায়ন কৌশল
এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলেছে ১০ আগস্ট। এনভিডিয়া ও ওয়াল স্ট্রিটের ছয়টি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি অংশীদারত্বের ঘোষণা আসে। এর মাধ্যমে পাঁচশো বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোয় বিনিয়োগের জন্য সংগ্রহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য মূলত ছোট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার ও এমন সব প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করা, যাদের জন্য গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ঋণ নেওয়া অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা এনভিডিয়ার গ্রাহকদের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। সেই অর্থ দিয়ে তারা এনভিডিয়ার তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে তথ্যকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করবে।

কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি বড় তথ্যকেন্দ্র নির্মাণেই প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের এত বড় স্থাপনা দরকার হয় না, কিন্তু ছোট পরিসরেও ব্যয়ের পরিমাণ কম নয়।
চিপকে জামানত বানিয়ে অর্থ সংগ্রহ
এনভিডিয়ার কৌশলটির অভিনব দিক হলো কম্পিউটিং সক্ষমতাকেই ঋণের জামানত হিসেবে ব্যবহার করা। এতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের এই খাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে ঝুঁকিও রয়েছে। একটি চিপ সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে। ফলে এসব চিপের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা প্রত্যাশামতো না বাড়লে সেই অবকাঠামোর কী হবে।
এনভিডিয়া এই ঝুঁকির কিছুটা নিজের কাঁধে নিচ্ছে। কোনো প্রকল্পের সম্পদের মূল্য নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে প্রকল্পের ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত ক্ষতির দায় নেওয়ার ব্যবস্থা করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রযুক্তির জন্য পরিচিত এনভিডিয়া এভাবেই আর্থিক প্রকৌশলেও নতুনত্ব দেখাচ্ছে।
গ্রাহকরাই যখন প্রতিদ্বন্দ্বী
এই নতুন কৌশলের পেছনে বড় কারণ হলো এনভিডিয়ার সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের আচরণে পরিবর্তন।
অ্যামাজন, গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফট এখন আর শুধু এনভিডিয়ার চিপ কিনে সন্তুষ্ট নয়। তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব চিপ তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।

গুগল বহু বছর ধরে তার মেঘভিত্তিক সেবার মাধ্যমে বিশেষায়িত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ ভাড়া দিয়ে আসছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি অন্য প্রতিষ্ঠানকেও সেই চিপভিত্তিক ব্যবস্থা বিক্রি করছে।
অ্যামাজনের নিজস্ব চিপ ব্যবসার বার্ষিক আয় এখন প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অ্যান্ডি জ্যাসি মনে করেন, এটি বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম তথ্যকেন্দ্র চিপ ব্যবসার একটি।
মাইক্রোসফট ও মেটাও নিজেদের চিপ তৈরি করছে। একই পথে হাঁটার পরিকল্পনা করছে বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই।
কেন নিজস্ব চিপে ঝুঁকছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো
এর পেছনে অর্থনৈতিক যুক্তি শক্তিশালী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্রের মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশই চিপের পেছনে যায়।
এনভিডিয়ার এইচ১০০ চিপ ব্যবহার করা একটি সার্ভার কাঠামোতে প্রতিটি চিপের দাম প্রায় ২৫ হাজার ডলার। বিশ্লেষকদের হিসাবে, এমন ব্যবস্থায় মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই চিপের জন্য যায়।
অন্যদিকে নিজস্বভাবে তৈরি বিশেষায়িত চিপের দাম এনভিডিয়ার চিপের তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। যদিও এসব চিপ সাধারণত কম শক্তিশালী, নির্দিষ্ট কাজের জন্য এগুলো অনেক বেশি কার্যকর।
গুগলের বিশেষায়িত চিপ তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জটিল হিসাব পরিচালনার জন্য তৈরি। মেটার নিজস্ব চিপ আবার ব্যবহারকারীদের জন্য কী ধরনের বিষয় বা সুপারিশ দেখানো হবে, সেই কাজের মতো নির্দিষ্ট প্রয়োজন মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি হলো—সব কাজের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী চিপ কেনার চেয়ে নির্দিষ্ট কাজের জন্য তুলনামূলক সস্তা চিপ ব্যবহার করাই অনেক ক্ষেত্রে বেশি লাভজনক।
নিজস্ব চিপই হতে পারে নতুন ব্যবসা
কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মনে করছে, নিজস্ব চিপ শুধু নিজেদের তথ্যকেন্দরের খরচ কমাবে না, বরং আলাদা ব্যবসায় পরিণত হতে পারে।
মে মাসে গুগল একটি বড় বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মেঘভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা গুগলের তৈরি চিপ ব্যবহার করে কম্পিউটিং ক্ষমতা ভাড়া দেবে। অ্যামাজনও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই অ্যামাজনের তৈরি ট্রেনিয়াম চিপ ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে।
এভাবে নিজস্ব চিপের বিস্তার এনভিডিয়ার জন্য বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারে। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপের চাহিদা ২০২৬ সালের প্রায় দেড় কোটি ইউনিট থেকে ২০৩০ সালে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ ইউনিটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশ হতে পারে নিজস্বভাবে তৈরি বিশেষায়িত চিপ, আর এনভিডিয়ার অংশ থাকতে পারে প্রায় ৪০ শতাংশ।
রাজস্বের দিক থেকে এনভিডিয়া সম্ভবত নেতৃত্ব ধরে রাখবে। কিন্তু সস্তা নিজস্ব চিপের বিস্তার প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এনভিডিয়ার পাল্টা যুক্তি
এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং অবশ্য এই প্রতিযোগিতাকে অন্যভাবে দেখছেন।
তার যুক্তি হলো, নিজস্ব চিপের সবচেয়ে বড় শক্তি—বিশেষায়িত হওয়া—একই সঙ্গে তার দুর্বলতাও। নির্দিষ্ট ও পরিচিত কাজের জন্য এসব চিপ অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু নতুন ধরনের কাজ সামনে এলে সেগুলোকে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া কঠিন।
এনভিডিয়ার চিপের বড় সুবিধা হলো বহুমুখিতা। একই চিপ বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ পরিচালনা করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি ভাষাভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে রোবট, চালকবিহীন যান এবং শিল্পকারখানার নানা কাজে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এই বহুমুখিতাই এনভিডিয়ার বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
এনভিডিয়ার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সহজ নয়
তবে এনভিডিয়াকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যয়বহুল এবং কঠিনও হতে পারে।
এনভিডিয়া এখন প্রতি দুই বছরের বদলে প্রায় প্রতি বছর নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী চিপ বাজারে আনছে। অন্যদিকে একটি অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ তৈরি করতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দুই থেকে তিন বছর সময় এবং এক থেকে তিন বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
এনভিডিয়া শুধু গত প্রান্তিকেই গবেষণা ও উন্নয়নে ছয় বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। এত বিপুল অর্থ এবং একই সঙ্গে দক্ষ প্রকৌশলী ধরে রাখার সামর্থ্য খুব কম প্রতিষ্ঠানেরই আছে।
এর পাশাপাশি চিপ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এনভিডিয়ার সুবিধা রয়েছে। অন্যের নকশা অনুযায়ী চিপ তৈরি করে এমন কারখানাগুলোর উৎপাদনক্ষমতা সীমিত। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়—সীমিত উৎপাদনক্ষমতা নিজেদের চিপের জন্য ব্যবহার করবে, নাকি গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে।
এনভিডিয়ার লক্ষ্য আরও বড়
হাইপারস্কেল প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সামলানোর পাশাপাশি এনভিডিয়া এখন নতুন গ্রাহকও খুঁজছে।
সরকারগুলো যখন নিজেদের দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরি করতে চাইছে, তখন তাদের কাছে চিপ বিক্রি করতে চায় এনভিডিয়া। একই সঙ্গে নিজস্ব তথ্যকেন্দ্র তৈরি করা প্রতিষ্ঠান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কম্পিউটিং ক্ষমতা ভাড়া দেওয়া নতুন ধরনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও লক্ষ্য করছে তারা।
জুলাইয়ে এনভিডিয়া এমন একটি কর্মসূচি চালু করেছে, যার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে এবং ভবিষ্যৎ আয়ের একটি অংশের বিনিময়ে তাদের অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হবে।
এনভিডিয়া ওপেনএআইকে ওহাইওতে একটি তথ্যকেন্দ্র ভাড়া নেওয়া এবং সেখানে নিজেদের চিপ ব্যবহারে সহায়তা করার জন্য প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব উদ্যোগ নিয়ে ‘চক্রাকার অর্থায়ন’-এর অভিযোগও উঠছে। এনভিডিয়ার বক্তব্য, নতুন ব্যবস্থায় বাইরের বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার মাধ্যমে এই ধরনের উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও প্রতিদ্বন্দ্বী—সব ভূমিকায় এনভিডিয়া
প্রযুক্তি বিশ্বের পুরোনো সম্পর্কগুলো এখন আর আগের মতো সরল নেই। এনভিডিয়া একই সঙ্গে সরবরাহকারী ও অর্থায়নকারী হয়ে উঠছে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান একসময় তার প্রধান গ্রাহক ছিল, তারাই এখন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী।
অন্যদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এনভিডিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল কম্পিউটিং চাহিদা তাদের পুরোপুরি আলাদা হয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।
ফলে সম্পর্কটি এখন বিচ্ছেদের চেয়ে বেশি এক ধরনের জটিল সহাবস্থান। সবাই যতটা সম্ভব কম্পিউটিং ক্ষমতা কিনছে, ভাড়া করছে কিংবা নিজেরাই তৈরি করছে। আর এই দৌড়ে এখনো সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী এনভিডিয়াই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















