একসময় ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই জাপানের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত টোকিওর একটি ছোট কক্ষে মাত্র ২০ জন কর্মী নিয়ে কাজ শুরু করা প্রতিষ্ঠানই পরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইলেকট্রনিকস সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। একই বছরে ধ্বংসপ্রাপ্ত কারখানা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল হোন্ডা। আর ১৯৮১ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সী সন মাসায়োশির ছোট সফটওয়্যার পরিবেশক প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে সফটব্যাংকের মতো বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
কিন্তু সেই উদ্যোক্তা-সৃষ্টির ঐতিহ্য সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এখন জাপানে বিশ্বমানের নতুন উদ্যোগের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুব কম। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি বিলিয়ন-ডলারের বেশি মূল্যমানের নতুন উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে জাপানে জন্ম নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ছয়টি। এমনকি ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের কোনো নতুন উদ্যোগও এখনো জাপান তৈরি করতে পারেনি।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া যথাক্রমে পাঁচটি ও ছয়টি এমন বিশাল উদ্যোগ তৈরি করেছে। জনসংখ্যার তুলনায়ও এই দুই দেশ জাপানের চেয়ে এগিয়ে।
তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। নতুন প্রজন্মের বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা এবং সরকারি উদ্যোগ মিলে জাপান আবার নতুন উদ্যোগের শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ঘাটতি
জাপানের বড় সমস্যা হলো ঝুঁকি নিতে আগ্রহী বিনিয়োগ মূলধনের স্বল্পতা। এক দশক আগেও দেশটিতে প্রচলিত ঝুঁকি মূলধন তহবিল ছিল খুবই কম। ২০১৫ সালে ৫০০টিরও কম চুক্তিতে মোট প্রায় ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছিল।
পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। ২০২৫ সালে জাপানে ঝুঁকি মূলধন সংগ্রহের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু অর্থনীতির আকারে জাপানের অর্ধেকের কাছাকাছি অস্ট্রেলিয়াও গত বছর প্রায় ৫০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। ফলে জাপানের অগ্রগতি এখনও যথেষ্ট নয়।
সমস্যা আরও গভীর। জাপানের কিছু সম্ভাব্য বড় বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানে বেশি অর্থ ঢালছে। ফলে দেশের নতুন উদ্যোগগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সব পর্যায়ে সমানভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী ও বড় সম্প্রসারণ পর্যায়ে ঝুঁকি নেওয়া বিনিয়োগের ঘাটতি প্রকট। জাপান প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগে বিশ্বের শীর্ষ দশের মধ্যে থাকলেও বড় অঙ্কের পরবর্তী পর্যায়ের বিনিয়োগে দেশটির অবস্থান ১৬তম।
এর ফলে নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনাময় ধারাও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর পর্যাপ্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান না থাকলে আন্তর্জাতিক বড় বিনিয়োগকারীরাও জাপানের বাজারে বড় অর্থ নিয়ে আসতে আগ্রহ হারায়।
খুব তাড়াতাড়ি শেয়ারবাজারে যাওয়ার চাপ
দ্বিতীয় সমস্যা হলো জাপানের নতুন উদ্যোগগুলো খুব দ্রুত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
মহামারির পর জাপানে যেসব নতুন উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাদের ৫৭ শতাংশই সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ২৩ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণের সুযোগ কম থাকা। বিশ্বের অনেক দেশে নতুন উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাথমিক বিনিয়োগকারীরা বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে বিনিয়োগের অর্থ তুলে নেন। জাপানে এমন সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অর্থের প্রয়োজন হলে অনেক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে বাধ্য হয়।
কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, জাপানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিই যেন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের বিনিয়োগ সংগ্রহের সমতুল্য। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত বড় করার বদলে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক ছোট অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করাই যেন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা গড়ে তোলার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা দ্রুত তালিকাভুক্তির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ছোট প্রতিষ্ঠানের ভিড়
এর ফলও স্পষ্ট। টোকিও শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধিমুখী বাজারে ২০২৫ সালের শেষে নতুন তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যম মূল্যমান ছিল মাত্র ১ হাজার কোটি ইয়েন, যা প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ ডলারের সমান।
আর ব্যর্থভাবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্যও খুব বড় শাস্তির মুখে পড়তে হয় না। তুলনামূলক শিথিল তালিকাচ্যুতির নিয়মের কারণে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন শেয়ারবাজারে পড়ে থাকতে পারে।
তবে কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও দ্রুত বড় হয়ে শেষ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যমান অর্জন করেছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে অনেকে ‘লুকানো বিশাল উদ্যোগ’ হিসেবে দেখেন।
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দ্রুত তালিকাভুক্তির চাপ দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথে বাধা তৈরি করছে।
উদ্যোক্তা হওয়ার সামাজিক মর্যাদাও কম
জাপানের তৃতীয় সমস্যা অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক।
ঝুঁকি নেওয়ার প্রতি জাপানি সমাজের ঐতিহ্যগত অনীহা উদ্যোক্তা তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এক বৈশ্বিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৪ শতাংশ জাপানি মনে করেন উদ্যোক্তা হওয়া আকাঙ্ক্ষিত পেশা। বিশ্বব্যাপী এই হার ৬৭ শতাংশ।
বিশেষ করে নিরাপদ ও স্থায়ী চাকরি ছেড়ে নতুন উদ্যোগ শুরু করা তরুণদের অনেক সময় পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে সংশয়ের মুখোমুখি হতে হয়।
এই সামাজিক চাপও উদ্যোক্তাদের দ্রুত শেয়ারবাজারে যাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কারণ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার বদলে দ্রুত তালিকাভুক্তি একটি সামাজিক ও আর্থিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে পরিস্থিতি
তবে আশার জায়গাও তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের ফলে জাপানে নতুন উদ্যোগের সংখ্যা ও মান বাড়ছে।
গত বছর সাকানা এআই নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ২৬০ কোটি ডলার মূল্যায়ন নিয়ে জাপানের সবচেয়ে মূল্যবান নতুন উদ্যোগে পরিণত হয়।
সরকারও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। ২০২২ সালে নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার জন্য একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি শুরু করা হয়। এর আওতায় সরকারি অর্থ ব্যবহার এবং নতুন উদ্যোগবিষয়ক দায়িত্বে একজন মন্ত্রী নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ বছরের মে মাসে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন উদ্যোগগুলোকে প্রতিষ্ঠান বিক্রি করাকেও বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচনা করতে উৎসাহিত করেছে।
এসব উদ্যোগ নতুন ব্যবসার সামাজিক ভাবমূর্তিও বদলাতে শুরু করেছে। তরুণ কর্মীদের একটি অংশ এখন বাবা-মায়ের প্রজন্মের মতো ধীরগতির, জ্যেষ্ঠতানির্ভর প্রতিষ্ঠানের বদলে দ্রুত পরিবর্তনশীল নতুন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে বেশি আগ্রহী।
শেয়ারবাজারও কঠোর হচ্ছে
টোকিও শেয়ারবাজারও ছোট ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে।
গত বছর তারা এমন একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যার আওতায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পাঁচ বছর পরও কোনো প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য ১ হাজার কোটি ইয়েন ধরে রাখতে না পারলে তাকে তালিকাচ্যুত করা হতে পারে। আগে এই সীমা ছিল ১০ বছরের মধ্যে ৪০০ কোটি ইয়েন।
নতুন নিয়মটি অবশ্য ২০৩০ সালের আগে কার্যকর হবে না।
শেয়ারবাজার কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যও স্পষ্ট—শেয়ারবাজারে প্রবেশ যেন প্রতিষ্ঠানের শেষ গন্তব্য না হয়ে বরং নতুন প্রবৃদ্ধির সূচনা হয়।
সামনে আরও বড় পরীক্ষা
তবু জাপানের সামনে পথ দীর্ঘ। একটি বৈশ্বিক পর্যায়ের ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারলে সেটি অন্য নতুন উদ্যোগগুলোর জন্য বড় ক্রেতায় পরিণত হতে পারে। সিলিকন ভ্যালিতে যেমন বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাবেক কর্মীদের তৈরি নতুন উদ্যোগ কিনে নেয়, তেমন একটি পরিবেশ জাপানেও তৈরি হতে পারে।
বিশ শতকের জাপানি উদ্যোক্তারা প্রায় শূন্য থেকে বিশাল ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, অল্প মূলধন এবং সীমিত সম্পদের মধ্যেও তারা থেমে যাননি।
এখন জাপানের নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের সামনে একই ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে এবার ধ্বংসস্তূপের বদলে তাদের লড়াই করতে হবে ঝুঁকি নিতে অনীহা, সীমিত বিনিয়োগ, দ্রুত তালিকাভুক্তির চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা গড়ে তোলার দুর্বল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। তারা যদি এই বাধাগুলো পেরোতে পারে, তাহলে জাপান আবারও বিশ্বমানের নতুন উদ্যোগ তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















