ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি তৈরি করলেও তেলের দাম পূর্বাভাস অনুযায়ী ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছায়নি। এর পেছনে সৌদি আরব, আবুধাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো কয়েকটি দেশের জরুরি পদক্ষেপ যেমন কাজ করেছে, তেমনি নীরবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চীন।
যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন আটকে যায়। কিন্তু একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইনে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ে এবং দরিদ্র দেশগুলোতে জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়।
তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে বেইজিং থেকে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে চীন তার অপরিশোধিত তেল আমদানি অর্ধেকে নামিয়ে আনে। দৈনিক প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল কম আমদানি করার এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি অন্তত ৩০ ডলার কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
চাহিদা কমিয়েই বাজার নিয়ন্ত্রণ
চীনের এই পদক্ষেপকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে চীন তেল কেনা কমায়নি। বরং অর্থনীতি মোটামুটি স্বাভাবিক গতিতেই চলেছে। অর্থাৎ প্রয়োজন হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশটি পরিকল্পিতভাবে তেলের চাহিদা কমিয়ে বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে তেল উৎপাদন কমিয়ে বা বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ও তার মিত্ররা। কিন্তু চীন দেখিয়ে দিয়েছে, বিপুল আমদানিকারক একটি দেশ চাইলে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করেও একই ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে।
একজন তেল ব্যবসায়ীর ভাষায়, চীনই এখন নতুন ওপেক।
একক সিদ্ধান্তের বাড়তি শক্তি
তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোটে সিদ্ধান্ত নিতে বহু দেশের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে এমন জটিলতা নেই। দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রয়োজনে একক সিদ্ধান্তে তেলের আমদানি, মজুত, পরিশোধন ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
চীনের বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার তিনটি—তেলের মজুত, পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবহার।
২০২৬ সালের শুরুতে তেলের দাম কম থাকাকালে চীন প্রায় ২০ কোটি ব্যারেল তেল কিনে তার মজুত আরও বাড়িয়ে নেয়। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেলের মজুত তখন প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেলে পৌঁছে যায়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেলে চীন সেই মজুত ব্যবহার করতে শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ তেল মজুত থেকে বের করে বাজারে ব্যবহার করা হয়। ফলে বিদেশ থেকে তেল আমদানির প্রয়োজনও দ্রুত কমে যায়।
রপ্তানির লাগাম টেনে দিল বেইজিং
চীনের দ্বিতীয় বড় অস্ত্র ছিল পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল পরিশোধনকারী দেশ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করে।
কিন্তু মার্চে সরকার দেশীয় পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন রপ্তানি চুক্তি বন্ধ করতে এবং আগের অনেক চুক্তি বাতিল করতে নির্দেশ দেয়। এর ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চীনের পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
বিশেষ করে উড়োজাহাজের জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ায় বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল দেশের ভেতরেই আটকে রাখা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সাধারণত আমদানি করা কিছু রাসায়নিক কাঁচামালের ঘাটতিও নিজেদের পরিশোধন ও উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এবার কমানো হলো দেশের ভেতরের চাহিদাও
তেলের আমদানি কমানোর তৃতীয় হাতিয়ার ছিল অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণ।
জুনে চীনের পরিশোধনাগারগুলো আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেল কম অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে। পেট্রলের উৎপাদন কমে যায় ১৪ শতাংশ। ডিজেল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির উৎপাদন কমে যায় ২১ শতাংশ করে।
জ্বালানির দাম বাড়তে দেওয়ায় অনেক নগরবাসী ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন, সাইকেল ও ভাড়ার গাড়ির দিকে ঝুঁকেছেন। একই সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহারও দ্রুত বেড়েছে। জাতীয় ছুটির এক সপ্তাহে মহাসড়কের পাশে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জ দেওয়ার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়ে যায়।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল কমে যাওয়ায় তার কিছুটা চাপও রেলপথ সামলেছে। স্থানীয় প্রশাসন কিছু অবকাঠামো নির্মাণকাজ পিছিয়ে দেওয়ায় ডিজেলের ব্যবহারও কমেছে।
অর্থনীতিতে ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা
![]()
এত বড় জ্বালানি সংকোচন সত্ত্বেও চীনের অর্থনীতিতে এখনো বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি। এর একটি কারণ বহু বছর ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক পরিবহন ও বিকল্প শক্তিতে চীনের বিপুল বিনিয়োগ।
আরেকটি কারণ হলো শিল্পক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে চীনের বিভিন্ন শিল্পে বহু বছর ধরে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পণ্য ও কাঁচামাল মজুত হয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কাঁচামাল কম এলেও কিছু সময়ের জন্য সেই মজুত ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
চীনের দ্বিতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এলেও এর প্রধান কারণ তেলের ঘাটতি নয়। বরং দুর্বল বিনিয়োগ ও আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটই অর্থনীতির ওপর বেশি চাপ তৈরি করছে।
তবে চীনও চিরদিন এভাবে চলতে পারবে না
চীনের হাতে বিপুল তেল, জ্বালানি ও শিল্পপণ্যের মজুত থাকলেও এসব সম্পদ সীমাহীন নয়। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট যেমন দীর্ঘ সময় উৎপাদন কমিয়ে রাখতে পারে, চীন তেমনভাবে অনির্দিষ্টকাল প্রতিদিন ৫৫ লাখ ব্যারেল কম তেল আমদানি করতে পারবে না।
তারপরও ইরান যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করেছে। কয়েক মাসের জন্য হলেও চীন একক সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক তেলের বাজারকে স্থিতিশীল করার মতো ক্ষমতা অর্জন করেছে।
একসময় তেলের বাজারে নিয়ন্ত্রণের প্রতীক ছিল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট। এখন সেই সমীকরণ বদলাচ্ছে। উৎপাদন কমানো নয়, চাহিদা কমানো, মজুত ব্যবহার এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করা যায়—চীন তার বাস্তব উদাহরণ দেখিয়ে দিয়েছে।
ফলে ভবিষ্যতের তেলবাজারে শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না। বাজারের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন কী কিনছে, কতটা মজুত করছে এবং কখন চাহিদা কমাচ্ছে—সেটিও হয়ে উঠতে পারে তেলের দামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
চীনের এই উত্থান তাই শুধু তেলবাজারের গল্প নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রেতার ক্ষমতা কীভাবে বিক্রেতার ক্ষমতার সমান বা কখনো তার চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে, তারও এক বড় দৃষ্টান্ত।
চীনের হাতে এখন শুধু তেলের চাহিদা নয়, বৈশ্বিক তেলের বাজারের মনস্তত্ত্বও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















