চীনে কম দামের চা ও ঠান্ডা পানীয় বিক্রির বিশাল ব্যবসা গড়ে তুলে এবার পানশালার বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে মিশুয়ে বিংচেং। প্রতিষ্ঠানটির অধিগ্রহণ করা ‘ফুলুজিয়া’ নামের পানশালা শৃঙ্খল মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে চীনের শহর থেকে প্রত্যন্ত সীমান্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২১ সাল থেকে দেশজুড়ে এর সংখ্যা ৩ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পানশালা শৃঙ্খলে পরিণত করেছে।
মাত্র কয়েক টাকায় এক পেয়ালা বিয়ার
ফুলুজিয়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর দাম। বড় শহর হোক কিংবা দুর্গম সীমান্ত শহর—এক পেয়ালা বিয়ারের দাম শুরু হচ্ছে মাত্র ৫ দশমিক ৯ ইউয়ান থেকে। ছোট আকারের এসব পানশালায় প্রায় ২০ ধরনের বিয়ার সরাসরি কল থেকে পরিবেশন করা হয়। বসার জায়গা সীমিত হলেও ভাজা মাংস, এডামামে বিনসহ নানা হালকা খাবারের ব্যবস্থা থাকে।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের প্রত্যন্ত লুশুই শহরে সম্প্রতি চালু হওয়া একটি ফুলুজিয়ার মালিকের মতে, এত কম দামে বিক্রি সম্ভব হওয়ার প্রধান কারণ প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা এখন মিশুয়ে বিংচেংয়ের হাতে।

মিশুয়ের বিশাল সরবরাহব্যবস্থাই মূল শক্তি
মিশুয়ে বিংচেংয়ের বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ হাজার বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। গত বছর বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যার বিচারে এটি ম্যাকডোনাল্ডসকেও ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্রুত খাবারের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।
অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটি ফুলুজিয়ার নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারত্ব কিনে নেয়। দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরনও অনেকটা একই—মূলত স্বত্বাধিকারভিত্তিক শাখা পরিচালনার মডেল।
প্রায় ৬০ হাজার ইউয়ান প্রাথমিক বিনিয়োগেই একজন উদ্যোক্তা একটি ছোট পানশালা চালু করতে পারেন। এর মধ্যে বিয়ার পরিবেশনের যন্ত্র, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সাজসজ্জা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকে। তবে দোকানের ভাড়া ও সংস্কারের খরচ আলাদা। প্রথম তিন বছর কোনো স্বত্বমূল্যও দিতে হয় না।
বিয়ার পৌঁছে যাচ্ছে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে
মিশুয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সরবরাহব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির মূল সাফল্য শুধু খাবার বা পানীয় বিক্রিতে নয়, বরং অতি দক্ষতার সঙ্গে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতায়।
ফুলুজিয়াও একই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। হেনান প্রদেশে উৎপাদিত বিয়ার পরিবহন করা হচ্ছে দেশজুড়ে বিভিন্ন শাখায়। এমনকি হেনান থেকে ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে অবস্থিত লুশুইয়ের মতো এলাকাতেও শাখা মালিকদের পরিবহন খরচ বহন করতে হচ্ছে না।
এই ব্যবস্থার কারণে ভোক্তার জন্য দাম কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। মিশুয়ের জনপ্রিয় লেবুর শরবতের দাম যেমন মাত্র ৪ ইউয়ান।
প্রতিদিন খুলছে নতুন শাখা
স্বত্বাধিকারভিত্তিক ব্যবসা ও শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয় মিশুয়েকে অত্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ দিয়েছে। ২০২৫ সালে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০টি নতুন মিশুয়ে শাখা চালু হয়েছে।
ফুলুজিয়ার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মিশুয়ে গত বছরের শেষ দিকে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ফুলুজিয়ার মোট ৩ হাজার ২০০ শাখার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চালু হয়েছে।
একই কৌশল মিশুয়ের কফি ব্যবসাতেও সাফল্য আনছে। গত বছরের শেষ নাগাদ চীনে ‘লাকি কাপ’ নামের এই কফি শৃঙ্খলের অন্তত ১০ হাজার শাখা ছিল।
চীনের বাইরে কি পৌঁছাবে সস্তা বিয়ার?
মিশুয়ের এই ব্যবসায়িক মডেল চীনের বাইরেও সফল হচ্ছে। দেশের বাইরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫ হাজার শাখা রয়েছে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডেও লাকি কাপের শাখা চালু হয়েছে।
ফুলুজিয়া এখনো বিদেশে সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। তবে নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মতো শহরে যেখানে এক পেয়ালা বিয়ারের দাম ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, সেখানে চীনের এই কমদামি পানশালা মডেল ভবিষ্যতে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে।
চীনের চা, কফি ও দ্রুত খাবারের ব্যবসায় যে কৌশল এত দ্রুত বিস্তার ঘটিয়েছে, সেটিই যদি পানশালার ক্ষেত্রেও কাজ করে, তাহলে পানীয় ব্যবসায়ও কম দামের নতুন এক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
চীনের এই মডেলের আসল শক্তি তাই শুধু সস্তা বিয়ার নয়; বরং কম খরচে বিপুলসংখ্যক ছোট ব্যবসাকে একই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















