০১:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
বিজ্ঞান কি সত্যিই ধীর হয়ে যাচ্ছে, নাকি ভুল তথ্যই তৈরি করছে এই ধারণা? মস্তিষ্কের জন্য নতুন ওষুধের দিগন্ত, জিএলপি-১-এর পর এবার ওরেক্সিনের পালা জাপানের বিশাল ইয়েন বাণিজ্য: বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারবারি এবার অবস্থান গুটোচ্ছে ট্রাম্পের চাপ, মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল কর্মসংস্থান—ফেডের নতুন প্রধানের সামনে পুরোনো সংকট সূচক তহবিল কি সত্যিই নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগ? সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারে নতুন জাগরণ, বড় বাজার গড়ার স্বপ্ন চীনের ঋণবোমা সামলাতে গিয়ে নিজেরাই ডুবছে ঋণ উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান চীনের হাতে এখন তেলের বাজারের রাশ, ওপেককে ছাপিয়ে নতুন শক্তি বেইজিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুনো পশ্চিম: অবিশ্বস্ত যন্ত্রমানবেই কি থমকে যাচ্ছে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ? এনভিডিয়া বনাম প্রযুক্তি জায়ান্ট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন লড়াই

ভবিষ্যতের সন্তান বেছে নিতে চাইছে সিলিকন ভ্যালি, বদলে যেতে পারে মানুষ তৈরির ধারণা

সন্তান হবে কেমন—এই প্রশ্নের উত্তর এত দিন মূলত ভাগ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপরই নির্ভর করত। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে সেই বাস্তবতা বদলানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি দুনিয়ার একদল নতুন উদ্যোক্তা এখন এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছেন, যার মাধ্যমে ভ্রূণ নির্বাচনের সময় ভবিষ্যৎ সন্তানের রোগঝুঁকির পাশাপাশি উচ্চতা, বুদ্ধিমত্তা, আয়ু, এমনকি চুল ও চোখের রঙ সম্পর্কেও সম্ভাব্য তথ্য জানা যাবে।

এই প্রযুক্তির নাম বহু-জিনভিত্তিক ভ্রূণ বাছাই। প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে সন্তান জন্মদানের পদ্ধতিই পাল্টে দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও নীতিবিদদের একটি বড় অংশ এর কার্যকারিতা, নির্ভুলতা ও নৈতিকতা নিয়ে গভীরভাবে প্রশ্ন তুলছেন।

পাতালরেল থেকে শুরু প্রচারণা

গত বছরের শেষ দিকে নিউইয়র্কের পাতালরেলে হঠাৎ দেখা যায় অদ্ভুত কিছু বিজ্ঞাপন। একটিতে বলা হয়েছিল, ‘আপনার সেরা সন্তানটি বেছে নিন।’ আরেকটিতে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বড় একটি অংশ বংশগত বলে দাবি করা হয়।

বিজ্ঞাপনগুলোর পেছনে ছিল ভ্রূণ পরীক্ষা নিয়ে কাজ করা নতুন প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়াস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কিয়ান সাদেঘি মনে করেন, এ ধরনের প্রযুক্তি আর কেবল ধনীদের গোপন পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়; এটি একদিন সাধারণ মানুষের পণ্য হয়ে উঠতে পারে।

একই খাতে কাজ করছে অর্কিড ও হেরাসাইটের মতো প্রতিষ্ঠানও। হেরাসাইটের পরীক্ষায় একটি ভ্রূণের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি উচ্চতা, বুদ্ধিমত্তা ও সম্ভাব্য আয়ু সম্পর্কে অনুমান দেওয়ার দাবি করা হয়। এর জন্য খরচ হতে পারে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। নিউক্লিয়াস আবার চুল ও চোখের রঙের মতো বৈশিষ্ট্যও যুক্ত করেছে।

সন্তান বাছাইয়ের নতুন দিগন্ত

Testing for desirable embryos inconsistent and unreliable, new study says -  The Japan Times

ভ্রূণ পরীক্ষার প্রযুক্তি একেবারে নতুন নয়। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সন্তান নেওয়া দম্পতিদের মধ্যে ইতিমধ্যে কিছু ধরনের ভ্রূণ পরীক্ষা চালু আছে।

এক ধরনের পরীক্ষায় ভ্রূণের ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিক কি না, তা দেখা হয়। আরেক ধরনের পরীক্ষায় একক জিনের কারণে সৃষ্ট বংশগত রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়। যেমন সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা হান্টিংটন রোগের মতো জেনেটিক অসুখ।

নতুন যে ধাপটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, সেটি হলো বহু জিনের সম্মিলিত প্রভাবের ভিত্তিতে ভ্রূণকে মূল্যায়ন করা। এর মাধ্যমে ক্যানসারের মতো কিছু রোগের ঝুঁকি থেকে শুরু করে উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার মতো বৈশিষ্ট্যের সম্ভাব্য মাত্রা অনুমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা যায়, কৃত্রিম প্রজনন নেওয়া দম্পতিদের ৪৩ শতাংশ নিরাপদ ও বিনা খরচে এমন পরীক্ষা পাওয়া গেলে সন্তানের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে তা ব্যবহার করতে আগ্রহী। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রেও একই আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কৃত্রিম প্রজননের খরচ কমানোর দৌড়

এই প্রযুক্তির বিস্তারের পথে বড় বাধা হলো কৃত্রিম প্রজননের উচ্চ খরচ। যুক্তরাষ্ট্রে একটি কৃত্রিম প্রজনন চক্রেই বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার ব্যয় হতে পারে। অধিকাংশ মানুষকে এই অর্থ নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়।

তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ এখন কৃত্রিম প্রজননের খরচ কমানোর দিকে নজর দিচ্ছে। কেউ দিচ্ছে প্রজনন বিমা, কেউ কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ। একটি প্রতিষ্ঠানের দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের ব্যবস্থা ব্যবহার করলে একজন রোগীর গড়ে প্রায় ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।

প্রজনন চিকিৎসার বিনিয়োগও বাড়ছে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রজনন খাতে নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে ৪৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারে পৌঁছেছিল।

প্রজনন চিকিৎসার খরচ ভবিষ্যতে অনেক কমে গেলে বাজারের আকারও নাটকীয়ভাবে বাড়তে পারে। প্রযুক্তির উন্নতি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, বৃহৎ পরিসরে কাজের সুবিধা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির মানসম্মতকরণের ফলে খরচ কমার আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা।

In vitro fertilisation - Wikipedia

ছয় ভ্রূণের মধ্যে একটি বেছে নিলেন দম্পতি

এই প্রযুক্তি যে এখন পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ নেই, তার একটি উদাহরণ প্রযুক্তিকর্মী আর্থার জে ও শিক্ষক চেজ পপের পরিবার।

সন্তান নেওয়ার সময় তাঁরা ছয়টি ভ্রূণের মধ্যে একটি বেছে নেন বহু জিনের ভিত্তিতে করা পরীক্ষার ফল দেখে। পরীক্ষায় একক জিনের রোগের ঝুঁকির পাশাপাশি একাধিক জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি রোগের সম্ভাবনাও দেখানো হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য উচ্চতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিসরও জানানো হয়।

দম্পতিটি বলছেন, তাঁরা সন্তানের উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার চেয়ে দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তাঁদের একজনের স্বীকারোক্তি, ছয়টি ভ্রূণের ফলাফল পাশাপাশি দেখে কোনটি তুলনামূলকভাবে ভালো মনে হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞান কতটা নির্ভরযোগ্য?

এখানেই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক।

বহু জিনভিত্তিক ঝুঁকি নির্ধারণের পদ্ধতি তৈরি হয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে। কোনো নির্দিষ্ট জিনগত বৈচিত্র্যের সঙ্গে কোনো রোগ বা বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক কতটা, তা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পাওয়া সম্পর্ককে একটি নির্দিষ্ট শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যবহার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের জিনতত্ত্ববিদ কেভিন মিচেলের মতে, বহু সন্তানের ক্ষেত্রে গড় প্রবণতা কাজে লাগলেও একটি নির্দিষ্ট শিশুর ক্ষেত্রে একই ফল নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

একটি গবেষণায় দেখা হয়েছিল, দশটি সুস্থ ভ্রূণের মধ্য থেকে বাছাই করলে প্রযুক্তির তৎকালীন সক্ষমতা অনুযায়ী সন্তানের উচ্চতায় মাঝামাঝি বাড়তি সুবিধা হতে পারে প্রায় ২ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার। বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পার্থক্য প্রায় তিন নম্বরের মতো। ফলে এই সুবিধা বাস্তব জীবনে কতটা বড় পরিবর্তন আনবে, সেটিও প্রশ্নের মুখে।

আর যদি বাছাই করার মতো ভ্রূণের সংখ্যা পাঁচটির কম হয়, সম্ভাব্য সুবিধা আরও দ্রুত কমে যেতে পারে।

শুধু জিন নয়, পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ

মানুষের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে জিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবকিছু জিন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি এবং জীবনযাপনের মতো বিষয় অনেক রোগ ও শারীরিক-মানসিক বৈশিষ্ট্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

Theory Suggests That All Genes Affect Every Complex Trait | Quanta Magazine

তার ওপর একটি জিন শরীরের একাধিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে কোনো একটি রোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য ভ্রূণ বেছে নিতে গিয়ে অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আরেকটি সমস্যা হলো, এসব গবেষণার তথ্যভান্ডারে বিশ্বের সব জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে একটি জনগোষ্ঠীর ওপর তৈরি ঝুঁকি নির্ধারণের পদ্ধতি অন্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একই রকম নির্ভুল নাও হতে পারে।

তবে গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে তথ্যভান্ডার বড় হলে এবং আরও বেশি মানুষের জিনগত তথ্য যুক্ত হলে এই প্রযুক্তির পূর্বাভাসের ক্ষমতা বাড়তে পারে।

প্রযুক্তির পরের ধাপ কি জিন সম্পাদনা?

বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, বিতর্কও তত গভীর হচ্ছে। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, ভ্রূণ বাছাইয়ের এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত নতুন ধরনের বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বা ইউজেনিক্সের দিকে নিয়ে যেতে পারে—যেখানে মানুষ নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে ‘ভালো’ এবং অন্য বৈশিষ্ট্যকে ‘খারাপ’ হিসেবে বেছে নিতে শুরু করবে।

আরেকটি আশঙ্কা হলো, ভ্রূণ বাছাইয়ের পরবর্তী ধাপ হতে পারে সরাসরি জিন পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রে মানবভ্রূণের বংশগত পরিবর্তন নিয়ে কার্যত দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে সেই সীমারেখা কত দিন অটুট থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

মানুষের ভবিষ্যৎ নাকি নতুন বৈষম্য?

সিলিকন ভ্যালির উদ্যোক্তাদের চোখে এটি হতে পারে প্রজনন চিকিৎসার পরবর্তী বিপ্লব। তাঁদের যুক্তি, প্রযুক্তি যদি রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কিছু ভয়াবহ বংশগত রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা অন্য জায়গায়। প্রযুক্তিটি যদি প্রথমে কেবল বিপুল অর্থসম্পদের অধিকারীদের নাগালে আসে, তাহলে সমাজে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে। ধনী পরিবারগুলো সন্তান জন্মের আগেই জিনগত সুবিধা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে, আর সাধারণ মানুষ সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

এখনও এই প্রযুক্তি সীমিত এবং ব্যয়বহুল। বিজ্ঞানও এর সক্ষমতা নিয়ে নিশ্চিত নয়। কিন্তু বিনিয়োগ, গবেষণা ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ যেভাবে বাড়ছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষ কীভাবে জন্ম নেবে, সেই প্রশ্নটি আর শুধু প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয় প্রযুক্তির এক অংশ।

আজকের ভ্রূণ বাছাই হয়তো ছোট একটি বাজার। কিন্তু আগামী দিনের প্রজনন প্রযুক্তির ভিত্তি যদি এখানেই তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সন্তান জন্মের সিদ্ধান্ত শুধু ‘সন্তান চাই কি না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং প্রশ্ন উঠতে পারে, কেমন সন্তান চাই?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ হয়তো বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার সামনে দাঁড়াবে—আবার একই সঙ্গে তার সবচেয়ে কঠিন নৈতিক পরীক্ষারও মুখোমুখি হবে।

মানুষ তৈরির প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, মানুষকে বেছে নেওয়ার অধিকার কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বিজ্ঞান কি সত্যিই ধীর হয়ে যাচ্ছে, নাকি ভুল তথ্যই তৈরি করছে এই ধারণা?

ভবিষ্যতের সন্তান বেছে নিতে চাইছে সিলিকন ভ্যালি, বদলে যেতে পারে মানুষ তৈরির ধারণা

১২:১৬:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

সন্তান হবে কেমন—এই প্রশ্নের উত্তর এত দিন মূলত ভাগ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপরই নির্ভর করত। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে সেই বাস্তবতা বদলানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি দুনিয়ার একদল নতুন উদ্যোক্তা এখন এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছেন, যার মাধ্যমে ভ্রূণ নির্বাচনের সময় ভবিষ্যৎ সন্তানের রোগঝুঁকির পাশাপাশি উচ্চতা, বুদ্ধিমত্তা, আয়ু, এমনকি চুল ও চোখের রঙ সম্পর্কেও সম্ভাব্য তথ্য জানা যাবে।

এই প্রযুক্তির নাম বহু-জিনভিত্তিক ভ্রূণ বাছাই। প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে সন্তান জন্মদানের পদ্ধতিই পাল্টে দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও নীতিবিদদের একটি বড় অংশ এর কার্যকারিতা, নির্ভুলতা ও নৈতিকতা নিয়ে গভীরভাবে প্রশ্ন তুলছেন।

পাতালরেল থেকে শুরু প্রচারণা

গত বছরের শেষ দিকে নিউইয়র্কের পাতালরেলে হঠাৎ দেখা যায় অদ্ভুত কিছু বিজ্ঞাপন। একটিতে বলা হয়েছিল, ‘আপনার সেরা সন্তানটি বেছে নিন।’ আরেকটিতে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বড় একটি অংশ বংশগত বলে দাবি করা হয়।

বিজ্ঞাপনগুলোর পেছনে ছিল ভ্রূণ পরীক্ষা নিয়ে কাজ করা নতুন প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়াস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কিয়ান সাদেঘি মনে করেন, এ ধরনের প্রযুক্তি আর কেবল ধনীদের গোপন পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়; এটি একদিন সাধারণ মানুষের পণ্য হয়ে উঠতে পারে।

একই খাতে কাজ করছে অর্কিড ও হেরাসাইটের মতো প্রতিষ্ঠানও। হেরাসাইটের পরীক্ষায় একটি ভ্রূণের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি উচ্চতা, বুদ্ধিমত্তা ও সম্ভাব্য আয়ু সম্পর্কে অনুমান দেওয়ার দাবি করা হয়। এর জন্য খরচ হতে পারে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। নিউক্লিয়াস আবার চুল ও চোখের রঙের মতো বৈশিষ্ট্যও যুক্ত করেছে।

সন্তান বাছাইয়ের নতুন দিগন্ত

Testing for desirable embryos inconsistent and unreliable, new study says -  The Japan Times

ভ্রূণ পরীক্ষার প্রযুক্তি একেবারে নতুন নয়। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সন্তান নেওয়া দম্পতিদের মধ্যে ইতিমধ্যে কিছু ধরনের ভ্রূণ পরীক্ষা চালু আছে।

এক ধরনের পরীক্ষায় ভ্রূণের ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিক কি না, তা দেখা হয়। আরেক ধরনের পরীক্ষায় একক জিনের কারণে সৃষ্ট বংশগত রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়। যেমন সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা হান্টিংটন রোগের মতো জেনেটিক অসুখ।

নতুন যে ধাপটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, সেটি হলো বহু জিনের সম্মিলিত প্রভাবের ভিত্তিতে ভ্রূণকে মূল্যায়ন করা। এর মাধ্যমে ক্যানসারের মতো কিছু রোগের ঝুঁকি থেকে শুরু করে উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার মতো বৈশিষ্ট্যের সম্ভাব্য মাত্রা অনুমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা যায়, কৃত্রিম প্রজনন নেওয়া দম্পতিদের ৪৩ শতাংশ নিরাপদ ও বিনা খরচে এমন পরীক্ষা পাওয়া গেলে সন্তানের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে তা ব্যবহার করতে আগ্রহী। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রেও একই আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কৃত্রিম প্রজননের খরচ কমানোর দৌড়

এই প্রযুক্তির বিস্তারের পথে বড় বাধা হলো কৃত্রিম প্রজননের উচ্চ খরচ। যুক্তরাষ্ট্রে একটি কৃত্রিম প্রজনন চক্রেই বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার ব্যয় হতে পারে। অধিকাংশ মানুষকে এই অর্থ নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়।

তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ এখন কৃত্রিম প্রজননের খরচ কমানোর দিকে নজর দিচ্ছে। কেউ দিচ্ছে প্রজনন বিমা, কেউ কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ। একটি প্রতিষ্ঠানের দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের ব্যবস্থা ব্যবহার করলে একজন রোগীর গড়ে প্রায় ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।

প্রজনন চিকিৎসার বিনিয়োগও বাড়ছে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রজনন খাতে নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে ৪৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারে পৌঁছেছিল।

প্রজনন চিকিৎসার খরচ ভবিষ্যতে অনেক কমে গেলে বাজারের আকারও নাটকীয়ভাবে বাড়তে পারে। প্রযুক্তির উন্নতি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, বৃহৎ পরিসরে কাজের সুবিধা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির মানসম্মতকরণের ফলে খরচ কমার আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা।

In vitro fertilisation - Wikipedia

ছয় ভ্রূণের মধ্যে একটি বেছে নিলেন দম্পতি

এই প্রযুক্তি যে এখন পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ নেই, তার একটি উদাহরণ প্রযুক্তিকর্মী আর্থার জে ও শিক্ষক চেজ পপের পরিবার।

সন্তান নেওয়ার সময় তাঁরা ছয়টি ভ্রূণের মধ্যে একটি বেছে নেন বহু জিনের ভিত্তিতে করা পরীক্ষার ফল দেখে। পরীক্ষায় একক জিনের রোগের ঝুঁকির পাশাপাশি একাধিক জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি রোগের সম্ভাবনাও দেখানো হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য উচ্চতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিসরও জানানো হয়।

দম্পতিটি বলছেন, তাঁরা সন্তানের উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার চেয়ে দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তাঁদের একজনের স্বীকারোক্তি, ছয়টি ভ্রূণের ফলাফল পাশাপাশি দেখে কোনটি তুলনামূলকভাবে ভালো মনে হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞান কতটা নির্ভরযোগ্য?

এখানেই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক।

বহু জিনভিত্তিক ঝুঁকি নির্ধারণের পদ্ধতি তৈরি হয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে। কোনো নির্দিষ্ট জিনগত বৈচিত্র্যের সঙ্গে কোনো রোগ বা বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক কতটা, তা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পাওয়া সম্পর্ককে একটি নির্দিষ্ট শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যবহার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের জিনতত্ত্ববিদ কেভিন মিচেলের মতে, বহু সন্তানের ক্ষেত্রে গড় প্রবণতা কাজে লাগলেও একটি নির্দিষ্ট শিশুর ক্ষেত্রে একই ফল নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

একটি গবেষণায় দেখা হয়েছিল, দশটি সুস্থ ভ্রূণের মধ্য থেকে বাছাই করলে প্রযুক্তির তৎকালীন সক্ষমতা অনুযায়ী সন্তানের উচ্চতায় মাঝামাঝি বাড়তি সুবিধা হতে পারে প্রায় ২ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার। বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পার্থক্য প্রায় তিন নম্বরের মতো। ফলে এই সুবিধা বাস্তব জীবনে কতটা বড় পরিবর্তন আনবে, সেটিও প্রশ্নের মুখে।

আর যদি বাছাই করার মতো ভ্রূণের সংখ্যা পাঁচটির কম হয়, সম্ভাব্য সুবিধা আরও দ্রুত কমে যেতে পারে।

শুধু জিন নয়, পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ

মানুষের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে জিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবকিছু জিন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি এবং জীবনযাপনের মতো বিষয় অনেক রোগ ও শারীরিক-মানসিক বৈশিষ্ট্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

Theory Suggests That All Genes Affect Every Complex Trait | Quanta Magazine

তার ওপর একটি জিন শরীরের একাধিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে কোনো একটি রোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য ভ্রূণ বেছে নিতে গিয়ে অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আরেকটি সমস্যা হলো, এসব গবেষণার তথ্যভান্ডারে বিশ্বের সব জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে একটি জনগোষ্ঠীর ওপর তৈরি ঝুঁকি নির্ধারণের পদ্ধতি অন্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একই রকম নির্ভুল নাও হতে পারে।

তবে গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে তথ্যভান্ডার বড় হলে এবং আরও বেশি মানুষের জিনগত তথ্য যুক্ত হলে এই প্রযুক্তির পূর্বাভাসের ক্ষমতা বাড়তে পারে।

প্রযুক্তির পরের ধাপ কি জিন সম্পাদনা?

বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, বিতর্কও তত গভীর হচ্ছে। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, ভ্রূণ বাছাইয়ের এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত নতুন ধরনের বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বা ইউজেনিক্সের দিকে নিয়ে যেতে পারে—যেখানে মানুষ নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে ‘ভালো’ এবং অন্য বৈশিষ্ট্যকে ‘খারাপ’ হিসেবে বেছে নিতে শুরু করবে।

আরেকটি আশঙ্কা হলো, ভ্রূণ বাছাইয়ের পরবর্তী ধাপ হতে পারে সরাসরি জিন পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রে মানবভ্রূণের বংশগত পরিবর্তন নিয়ে কার্যত দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে সেই সীমারেখা কত দিন অটুট থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

মানুষের ভবিষ্যৎ নাকি নতুন বৈষম্য?

সিলিকন ভ্যালির উদ্যোক্তাদের চোখে এটি হতে পারে প্রজনন চিকিৎসার পরবর্তী বিপ্লব। তাঁদের যুক্তি, প্রযুক্তি যদি রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কিছু ভয়াবহ বংশগত রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা অন্য জায়গায়। প্রযুক্তিটি যদি প্রথমে কেবল বিপুল অর্থসম্পদের অধিকারীদের নাগালে আসে, তাহলে সমাজে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে। ধনী পরিবারগুলো সন্তান জন্মের আগেই জিনগত সুবিধা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে, আর সাধারণ মানুষ সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

এখনও এই প্রযুক্তি সীমিত এবং ব্যয়বহুল। বিজ্ঞানও এর সক্ষমতা নিয়ে নিশ্চিত নয়। কিন্তু বিনিয়োগ, গবেষণা ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ যেভাবে বাড়ছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষ কীভাবে জন্ম নেবে, সেই প্রশ্নটি আর শুধু প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয় প্রযুক্তির এক অংশ।

আজকের ভ্রূণ বাছাই হয়তো ছোট একটি বাজার। কিন্তু আগামী দিনের প্রজনন প্রযুক্তির ভিত্তি যদি এখানেই তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সন্তান জন্মের সিদ্ধান্ত শুধু ‘সন্তান চাই কি না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং প্রশ্ন উঠতে পারে, কেমন সন্তান চাই?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ হয়তো বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার সামনে দাঁড়াবে—আবার একই সঙ্গে তার সবচেয়ে কঠিন নৈতিক পরীক্ষারও মুখোমুখি হবে।

মানুষ তৈরির প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, মানুষকে বেছে নেওয়ার অধিকার কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।