যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি শিল্পের ভবিষ্যত এখন এক অবিশ্বাস্য আইনি দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের মধ্যে গাড়ি নির্গমন নীতি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন নিয়ে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা দেশজুড়ে গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম, বিনিয়োগ ও পরিকল্পনাকে চরমভাবে প্রভাবিত করছে। ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য decades ধরে শক্তিশালী পরিবেশ রক্ষা নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং নিজের পরিবেশ নীতি নির্ধারণের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সমঝোতা বজায় রেখেছে। কিন্তু সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসি রিপাবলিকানরা এই অধিকারকে বাতিল করার চেষ্টা করেছে, যা নতুন আইনি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
আইনি সংঘাতের পটভূমি
ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে তার নিজস্ব যানবাহন নির্গমন মানদণ্ড প্রবর্তন করে আসছে। ১৯৫০-এর দশকে লস অ্যাঞ্জেলেসের ভয়াবহ ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ মোকাবেলায় রাজ্যটি কঠোর পরিবেশ নীতি গ্রহণ করে। পরে ১৯৬৭ সালের এয়ার কোয়ালিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে কংগ্রেস ক্যালিফোর্নিয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, যার মাধ্যমে রাজ্য নিজস্ব নির্গমন নীতি প্রণয়ন করতে পারবে। এই অধিকার পেতে রাজ্যকে ফেডারেল পরিবেশ সংস্থা বা EPA থেকে ওয়াইভার মঞ্জুর করা হয়েছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য ও ফেডারেল সরকার একটি সমন্বিত পরিবেশ নীতি অনুসরণ করেছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক প্রশাসনের সময় এই নীতি ইভি উন্নয়ন এবং জ্বালানি-দক্ষ গাড়ি উৎপাদনের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিষয়টি উল্টে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল ইভি সহায়তা বাতিল করেছে, গাড়ি প্রস্তুতকারকদের জন্য কঠোর নির্গমন মান শিথিল করেছে এবং ওয়াইভার বাতিল করার চেষ্টা করছে।
দুই নীতির সংঘর্ষ
ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে গাড়ি উৎপাদনে ১০০ শতাংশ ইভি বা জিরো-এমিশন গাড়ি বিক্রির লক্ষ্য স্থির করেছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য মাঝারি সময়ের লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এই লক্ষ্য ও প্রণোদনা বাতিল করেছে, যা ইভি বিক্রিকে দেশজুড়ে হ্রাস করেছে। যদি ক্যালিফোর্নিয়া জয়ী হয়, তাহলে গাড়ি প্রস্তুতকারকদের দুই বিপরীত নীতি মানতে হবে। একদিকে থাকবে ট্রাম্প প্রশাসনের সীমিত বা শিথিল ফেডারেল নীতি, অন্যদিকে থাকবে ক্যালিফোর্নিয়ার কঠোর পরিবেশ বিধি। এটি গাড়ি শিল্পের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা সৃষ্টি করবে।

গাড়ি প্রস্তুতকারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া ও ১১টি অন্য রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার কঠোর ইভি নীতি গ্রহণ করেছে। একত্রে এই রাজ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নতুন গাড়ি বাজারের প্রায় ২৯ শতাংশ দখল করে। যদি ক্যালিফোর্নিয়া জয়ী হয়, তাহলে ঐ অঞ্চলে গাড়ি প্রস্তুতকারকরা তাদের মডেল লাইন পরিবর্তন করে দুই ধরনের নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য হবে। এটি গ্রাহকদের গাড়ি পছন্দ সীমিত করবে এবং কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করবে।
আইনি প্রক্রিয়া ও শোনানি
ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য দাবি করেছে যে ওয়াইভার বাতিলের প্রক্রিয়া অবৈধভাবে করা হয়েছে। রাজ্য আদালতে মামলা করেছে এবং ফেডারেল সরকারও মামলা খারিজের জন্য আবেদন করেছে। আদালতের রায় গাড়ি শিল্পের ভবিষ্যত এবং ইভি উৎপাদন নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আইনজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলায় অনেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনো আদালতে কখনো যাচাই হয়নি। তাই রায় কেমন হবে তা বলা কঠিন।
শিল্প ও বাজারের প্রভাব
আইনি দ্বন্দ্ব ও নীতি সংশয়ের কারণে গাড়ি প্রস্তুতকারকরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক কোম্পানি এখন ক্যালিফোর্নিয়ার নীতি মেনে চলছে, কারণ তারা নিশ্চিত হতে চায় না যে ট্রাম্প প্রশাসনের শিথিল নীতি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না। ইভি বাজারের চাহিদা কমতে শুরু করেছে, ফলে রাজ্যের ২০২৫ সালের লক্ষ্য বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাড়ি প্রস্তুতকারকদের বোঝাপড়া করতে হবে, যাতে তারা দুটি ভিন্ন নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
পরিবেশ নীতি ও ইভি ভবিষ্যত
এই আইনি সংঘর্ষ শুধু গাড়ি প্রস্তুতকারকদের জন্য নয়, পুরো পরিবেশ নীতি এবং জ্বালানি-দক্ষ গাড়ি উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের সিদ্ধান্ত ক্যালিফোর্নিয়া ও ফেডারেল সরকারের মধ্যে নীতি সমন্বয় বা সংঘাত নির্ধারণ করবে। এছাড়া, ইভি বিক্রির উপর প্রভাব ফেলবে এবং গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রভাব বিস্তার করবে।
সারসংক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্প ও পরিবেশ নীতি এখন এক অপরিচিত ও অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি। ট্রাম্প প্রশাসন ও ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যে আইনি সংঘাত শুধু আদালতের রায়ে নির্ভর করছে। এই বিরোধের ফলে ইভি উৎপাদন, পরিবেশ নীতি ও গাড়ি শিল্পের ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে। মার্কিন গাড়ি শিল্পের ভবিষ্যত এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
Sarakhon Report 



















