বিশ্বনেতাদের সাম্প্রতিক এক সম্মেলন স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কূটনৈতিক আশ্বাস দেওয়া হলেও ইউরোপীয় নেতারা ওয়াশিংটনের বার্তায় পুরোপুরি ভরসা করতে পারছেন না।
মিউনিখ সম্মেলনে আশ্বাসের চেষ্টা
ইউরোপের উদ্বেগ কমাতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি এলব্রিজ কলবি ইউরোপ সফর করেন। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়ে রুবিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন এবং ইউরোপীয়দের অতীত সামরিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। তার বক্তব্যে রক্ষণশীল মূল্যবোধের ছাপ থাকলেও আগের বছরের তুলনায় সুর ছিল অনেকটা নরম, যা কিছুটা স্বস্তি দেয় উপস্থিতদের।
ইউরোপকে প্রতিরক্ষা জোরদারের বার্তা
এলব্রিজ কলবি ইউরোপীয় দেশগুলোকে মূল্যবোধের পার্থক্য নিয়ে কম চিন্তা করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপ যদি নিজস্ব প্রচলিত প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো মিত্রদের জন্য পারমাণবিক নিরাপত্তা ছাতা বজায় রাখবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, মিত্রদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারে ওয়াশিংটন সমর্থন করে না।
আশ্বাসে আস্থা ফেরেনি
সম্মেলনের আড়ালের আলোচনায় ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের কর্মকর্তারা মার্কিন বার্তায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট হননি। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মন্তব্য ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ‘মাফিয়া ধাঁচের চাপ’ বলেও বর্ণনা করেছেন।
বিরোধপূর্ণ কৌশল নিয়ে প্রশ্ন
মার্কিন প্রশাসন একদিকে ইউরোপকে রাশিয়া ঠেকাতে আরও শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র কিনতে বলছে, অন্যদিকে পারমাণবিক কৌশল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে যুদ্ধ শুরু হলে এই বিভাজন টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে পড়বে।
মিউনিখে উপস্থিত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক বিপিন নারাং সতর্ক করে বলেন, ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে কোনো সংঘাতই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে স্পর্শ না করে থাকতে পারে না। তার মতে, ইউরোপকে দূরপাল্লার অস্ত্রে উৎসাহিত করা ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পুতিনপন্থী রাজনীতির ছায়া
সম্মেলনের পর রুবিওর স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি সফরও বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়াকে অনেকেই সাংঘর্ষিক বার্তা হিসেবে দেখছেন, কারণ অরবানকে রুশপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে ইউরোপকে রাশিয়ার প্রভাব থেকে দূরে রাখার মার্কিন আহ্বান দুর্বল হয়ে পড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ন্যাটোতে বাড়ছে উদ্বেগ
ন্যাটো কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে গেলে ইউরোপের পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে অন্তত এক দশক সময় লাগতে পারে। ফলে আপাতত আমেরিকার ওপর নির্ভরতা থাকলেও ইউরোপীয় মিত্ররা ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প ভাবতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিত্রদের আংশিকভাবে দূরে সরিয়ে রেখে নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। আস্থা ক্ষয়ে গেলে জোটের শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে—মিউনিখের আলোচনায় সেটিই সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















