প্রযুক্তি জগতে বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকা পেরোভস্কাইট পদার্থ এবার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। এতদিন সৌরকোষ ও টেলিভিশন পর্দা উন্নত করার ক্ষেত্রে এর কথা বলা হলেও বাস্তবে বড় পরিসরে সাফল্য আসেনি। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মস্তিষ্কের মতো কাজ করতে পারে এমন নতুন ধরনের কম্পিউটার তৈরিতে এই পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন আবার আলোচনায় পেরোভস্কাইট
পেরোভস্কাইটের বৈদ্যুতিক ও আলোক বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্র। তবুও বিনিয়োগ ও মনোযোগ মূলত অন্য প্রযুক্তির দিকে চলে যাওয়ায় এটি বিশেষায়িত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে, কারণ এমন একটি ক্ষেত্র সামনে এসেছে যেখানে প্রতিষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি নেই।
মস্তিষ্কের মতো কম্পিউটার কীভাবে কাজ করবে
প্রচলিত কম্পিউটারে স্মৃতি ও প্রসেসর আলাদা থাকে। ফলে তথ্য এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাতায়াত করতে গিয়ে সময় ও শক্তি বেশি খরচ হয়। কিন্তু নিউরোমর্ফিক কম্পিউটারে তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ একই যন্ত্রাংশে হবে, ঠিক মানুষের মস্তিষ্কের মতো। মস্তিষ্কে নিউরন ও তাদের সংযোগ একসঙ্গে এই দুই কাজ করে।
পেরোভস্কাইটের গঠন কেন গুরুত্বপূর্ণ
পেরোভস্কাইট হলো বিশেষ রাসায়নিক গঠনের যৌগ, যার সাধারণ সূত্র এবিএক্স৩। এতে ধনাত্মক ধাতব আয়ন ও ঋণাত্মক অধাতব আয়ন বিশেষ বিন্যাসে সাজানো থাকে এবং ভেতরে ফাঁকা জায়গা থাকে। এই ফাঁক দিয়ে অন্য পরমাণু ঢুকতে পারে, ফলে পদার্থটির বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য বদলানো সম্ভব হয়।
মেমরিস্টর তৈরিতে বড় সম্ভাবনা
সঠিক আয়ন নির্বাচন করলে হ্যালাইড পেরোভস্কাইটের বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ উচ্চ ও নিম্ন অবস্থার মধ্যে বদলাতে পারে। তখন এটি মেমরিস্টর হিসেবে কাজ করে। মেমরিস্টর এমন একটি উপাদান যা একই সঙ্গে নিউরন ও সিন্যাপ্সের ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে এটি নিউরোমর্ফিক কম্পিউটার তৈরির মূল ভিত্তি হতে পারে।
কৃত্রিম সিন্যাপ্স কীভাবে অনুকরণ করা হচ্ছে
বাস্তব সিন্যাপ্স ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী হয় এবং অব্যবহারে দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষকেরা কৃত্রিম ব্যবস্থায় একই আচরণ তৈরি করেছেন। রূপার ইলেকট্রোড ব্যবহার করলে রূপার পরমাণু পেরোভস্কাইটে ঢুকে সূক্ষ্ম পরিবাহী সুতা তৈরি করে। এই সুতা অক্ষত থাকলে প্রতিরোধ কম থাকে, ভেঙে গেলে প্রতিরোধ বেড়ে যায়। নির্দিষ্ট ভোল্টেজের মাধ্যমে এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং সেটি পরিবর্তন না করা পর্যন্ত স্থির থাকে। এভাবেই একই সঙ্গে তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হয়।

নিউরন অনুকরণে নতুন কৌশল
নিউরনের কাজ নকল করতে মেমরিস্টরের সঙ্গে একটি ক্যাপাসিটার যুক্ত করতে হয়। ক্যাপাসিটার সাময়িকভাবে চার্জ জমা রাখে এবং নির্দিষ্ট সীমা ছাড়ালে হঠাৎ বৈদ্যুতিক সংকেত ছাড়ে। এতে মেমরিস্টরের প্রতিরোধ বদলে যায় এবং সংকেত নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক এভাবেই জীবন্ত নিউরন কাজ করে।
কবে দেখা যেতে পারে প্রথম নমুনা
গবেষকদের ধারণা, মেমরিস্টর ও ক্যাপাসিটার যুক্ত করে নিউরোমর্ফিক নেটওয়ার্কের একটি প্রাথমিক নমুনা আগামী বছরের মধ্যেই তৈরি হতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি মূলধারায় জায়গা করে নিতে পারবে কি না, তা এখনো সময়ই বলে দেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















