যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরিকল্পনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা দ্রুত এমন একটি শক্তিশালী সফটওয়্যার চালুর পথে এগোচ্ছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কারের উপযোগী ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তির ব্যবহার, গোপনীয়তা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

কেন এই সফটওয়্যার
সরকারি নথি অনুযায়ী, নতুন সফটওয়্যারটির নাম ‘ইমিগ্রেশনওএস’। এটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সহিংস অপরাধীদের পর্যন্ত দ্রুত শনাক্ত করা যায়। প্রশাসনের লক্ষ্য বছরে বিপুলসংখ্যক বহিষ্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করা, ফলে সংস্থার ওপর চাপও বেড়েছে।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এত বড় পরিসরে স্বয়ংক্রিয় বাছাই ব্যবস্থা নিরপরাধ বহু মানুষকেও জড়িয়ে ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীদের তুলনায় নিয়ম মেনে চলা অনথিভুক্ত অভিবাসীদের তথ্যভাণ্ডার বেশি স্পষ্ট হওয়ায় তারা ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।

আইনি চ্যালেঞ্জ বাড়ছে
নাগরিক অধিকারকর্মীরা ইতিমধ্যে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক এক মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযানে নির্বিচারে আটক ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটছে। বিচারকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
প্রাক্তন এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, এই ধরনের প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করাই স্বাভাবিক। তার মতে, সন্ত্রাসবিরোধী কাজে তৈরি প্রযুক্তি যদি অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে আইনি জটিলতা আরও বাড়বে।
ডেটার বিশাল জাল
সংস্থাটি বহু বছর ধরেই বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করছে। যানবাহন ব্যবহার, ফোন ও বিদ্যুৎ সংযোগ, স্থানীয় পুলিশ, আদালত, বাণিজ্যিক ডেটাবেস এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য এক পর্দায় সব তথ্য দেখিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ভিসা আবেদনের জালিয়াতি শনাক্তকরণে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে একই ধরনের গল্প পুনরাবৃত্তির প্রবণতাও এই প্রযুক্তি ধরতে পারবে।

ভুল শনাক্তের ঝুঁকি
তবে প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এক ঘটনায় দেখা যায়, ভুল পরিচয়ের ভিত্তিতে একজন ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে আটক করা হয়, পরে জানা যায় যাকে খোঁজা হচ্ছিল তিনি ইতিমধ্যে কারাগারে ছিলেন।
গোপন অ্যালগরিদম কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটিও পরিষ্কার নয় বলে সমালোচকদের অভিযোগ। এতে ভুল শনাক্তের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
তথ্য পাওয়ার নতুন কৌশল
কিছু সংস্থা সরাসরি তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালেও কর্তৃপক্ষ বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। আদালতের আদেশ নিয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অনেক দ্রুত করা হচ্ছে।
এছাড়া বেসরকারি ডেটা সংগ্রাহকদের কাছ থেকেও তথ্য কেনা হচ্ছে। বিজ্ঞাপন সংস্থা, নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী যন্ত্র, ভিডিও ডোরবেল সেবা এবং মুখাবয়ব শনাক্ত প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে নজরদারির পরিধি দ্রুত বাড়ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কা
সমালোচকদের বড় উদ্বেগ হলো ‘মিশন ক্রিপ’। অর্থাৎ অপরাধী শনাক্তের বাইরে প্রযুক্তি ব্যবহার বিস্তৃত হয়ে রাজনৈতিক কর্মী বা প্রতিবাদকারীদের ওপর নজরদারিতে গড়াতে পারে। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার অভিযানে বাধা দেওয়া কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনি কাঠামো এখনো পরিষ্কার নয়। এই অনিশ্চয়তাকেই অনেকেই ব্যবহারের নীরব অনুমতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আদালতে চ্যালেঞ্জের সুযোগ এখনো রয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















