সিঙ্গাপুরের মতো দ্বীপ রাষ্ট্রে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনের গুরুত্ব এখন সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক দিনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি দেশটিকে সরাসরি আঘাত করছে। জলবায়ু অভিযোজনকে বিজ্ঞানীরা ‘ভ্যাকসিন’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা মানুষ ও স্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
সিনিয়র পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নমন্ত্রী জানিল পুতুচিয়ারি ফেব্রুয়ারি ১১ তারিখে বলেছেন, সিঙ্গাপুরকে তার অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে এবং জলবায়ুর প্রভাবের অভিযোজনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে কার্বন নিঃসরণের কমানোর প্রচেষ্টা অনেকাংশেই ব্যাহত হয়েছে।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে চরম আবহাওয়ার প্রভাব দেখা গেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায় এবং ভারি বৃষ্টির সঙ্গে উচ্চ জোয়ারের সময় উপকূলীয় এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। পরিবেশমন্ত্রী গ্রেস ফু ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে সংসদে জানিয়েছেন, শুষ্ক আবহাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রা সম্ভাব্য বন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াবে এবং ধোঁয়া সিঙ্গাপুরে পৌঁছাতে পারে।
জলবায়ু অভিযোজন ও নিঃসরণ হ্রাস সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিঙ্গাপুরের মতো নিম্নভূমি দ্বীপ রাষ্ট্রে আবহাওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বন্যা ও উপকূলীয় সুরক্ষা বিলম্বিত হলে বীমা কোম্পানির প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ব্যবসার খরচ আরও বাড়াবে। গবেষণা অনুযায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্যার কারণে আর্থিক ক্ষতি আগামীতে ১০০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে সংসদে প্রস্তাবিত একটি আইন অনুযায়ী, সরকারী সংস্থা এবং উপকূলীয় জমিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, না হলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা জানান, এই ধরনের পদক্ষেপ না নিলে বীমার খরচ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে।

সিঙ্গাপুরের নিজস্ব সমাধান যেমন উপকূলীয় বন্যা প্রতিরোধ এবং তাপজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধ, দেশের অর্থনীতির জন্যও সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। জানিল পুতুচিয়ারি উল্লেখ করেন, জলবায়ু অভিযোজনের উদ্যোগও অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে, যেমন দেশটি পানির প্রযুক্তি রপ্তানি করছে।
২০২৫ সালের দুটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী দশকে জলবায়ু অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতায় ব্যয় ৫০০ বিলিয়ন থেকে ১.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য হ্যাজার্ড ওয়ার্নিং সিস্টেম, বন্যা বাধা ও জরুরি চিকিৎসা সেবা বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময়।
সিঙ্গাপুর দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু অভিযোজনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী লি হসিয়েন লুং জাতীয় দিবস বক্তৃতায় বলেছেন, দেশের জলবায়ু সুরক্ষা বাহিনীর মতোই জরুরি। কিন্তু জনগণকেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য স্থানীয় সমাধান, পরিবার ও প্রতিবেশীর সহায়তা প্রয়োজন।
প্রফেসর হার্ভি নিও উল্লেখ করেন, জলবায়ুর প্রভাবকে ভবিষ্যতের দূরের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করলে মানুষ সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিতে দেরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ‘পান্ডোরার বাক্সের অজুহাত’ তৈরি করে।
সিঙ্গাপুর ২০২৭ সালে তার প্রথম জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা প্রকাশ করবে। এটি দেশের উপকূলে সবচেয়ে খারাপ প্রভাব প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মানচিত্র হিসেবে কাজ করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















