ইউরোপে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত পোল্যান্ডে এখন দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার প্রতি দেশটির জনসমর্থন কমছে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যু নতুন করে বিভাজন তৈরি করছে।
ভুয়া ভিডিওতে শক্ত সম্পর্কের বার্তা
১৩ ফেব্রুয়ারি পোল্যান্ডে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত টমাস রোজ সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যায়, ক্রাকোভে তাদেউশ কোশচিউশকোর স্মৃতিস্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারল নাভরোকির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন এবং আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ছে। পরে জানা যায়, এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি ভুয়া ভিডিও, যা দুই দেশের সম্পর্কের শক্ত অবস্থান বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল।

জরিপে কমছে আমেরিকা-সমর্থন
দীর্ঘদিন ইউরোপে আমেরিকার সবচেয়ে জোরালো সমর্থক ছিল পোল্যান্ড। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পর সেই অবস্থান নরম হয়েছে। গত এপ্রিলে গবেষণা সংস্থা সিবিওএসের জরিপে মাত্র ৩১ শতাংশ পোলিশ নাগরিক দুই দেশের সম্পর্ককে ভালো বলেছেন, যা ১৯৮৮ সালের পর সর্বনিম্ন।
আরেক জরিপে দেখা গেছে, এখনও অনেক পোলিশ নাগরিক ইউরোপীয় স্বায়ত্তশাসনের চেয়ে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তবে এই মাসে আরেক সংস্থার জরিপে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখছেন।
মন্তব্য ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনা
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছেন রাষ্ট্রদূত রোজ। তিনি জানান, ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য নন—এমন মন্তব্য করায় পোল্যান্ডের পার্লামেন্ট স্পিকার ভ্লোদজিমিয়ের্জ চারজাস্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
চারজাস্তির দল নিউ লেফট পার্লামেন্টে ছোট হলেও তারা ক্ষমতাসীন জোটের অংশ। ফলে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক তার পক্ষে দাঁড়ান, যা উত্তেজনা আরও বাড়ায়।

সামরিক সহযোগিতা শক্ত, কিন্তু ফাটল স্পষ্ট
সবকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক এখনও শক্তিশালী। গত বছর পোল্যান্ড তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৪.৫ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা ন্যাটোর মধ্যে সর্বোচ্চ। দেশটি মূলত আমেরিকান যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, হামলা হেলিকপ্টার, রকেট ব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে।
তবে রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে সম্পর্কের ভেতরে ফাটল স্পষ্ট হচ্ছে। টাস্ক ইউরোপমুখী উদারপন্থী নেতা, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নাভরোকি ডানপন্থী ল অ্যান্ড জাস্টিস দলের সমর্থিত।
যুক্তরাষ্ট্র ইস্যুতে টাস্ক-নাভরোকি দ্বন্দ্ব
ট্রাম্প পোল্যান্ডকে তার প্রস্তাবিত শান্তি বোর্ডে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালে প্রেসিডেন্ট নাভরোকি তাতে আগ্রহ দেখান। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী টাস্ক তা নাকচ করে দেন এবং বলেন, পোল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলেও কারও অধীনস্থ হবে না।
মার্চে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ঋণ ব্যবহারের একটি বিল প্রেসিডেন্টের কাছে গেলে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। ল অ্যান্ড জাস্টিস চায় প্রেসিডেন্ট বিলটি ভেটো দিন, কারণ তাদের মতে এতে আমেরিকা থেকে অস্ত্র কেনার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
অচলাবস্থায় পোলিশ রাজনীতি
টাস্ক ও নাভরোকির টানাপোড়েনে পোল্যান্ডের রাজনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসেই ২৫টি বিলে ভেটো দিয়েছেন, যা তার পূর্বসূরির এক দশকের রেকর্ডকেও ছাড়িয়েছে।
এই অচলাবস্থার কারণে কঠোর গর্ভপাত আইন শিথিল করা এবং বিচারব্যবস্থা সংস্কারের মতো পরিকল্পনাও থমকে আছে।

অর্থনীতি টাস্ককে দিচ্ছে সুবিধা
রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও অর্থনীতি টাস্ক সরকারের পক্ষে কাজ করছে। গত বছর দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৬ শতাংশ এবং বেকারত্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, ৩.২ শতাংশ।
সাম্প্রতিক জরিপে টাস্কের সিভিক কোয়ালিশন দল ল অ্যান্ড জাস্টিসের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
সামনে আরও বিভাজনের আশঙ্কা
ল অ্যান্ড জাস্টিস ইতিমধ্যে চারজাস্তির পদত্যাগ দাবি করেছে, যা সরকারে ভাঙন ধরানোর কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলোর প্রতি সমর্থন দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসন টাস্ক সরকারের পতন দেখতে চাইতে পারে।
একসময় পোল্যান্ডে আমেরিকা-সমর্থন ছিল সর্বসম্মত বিষয়। এখন সেটিই দেশটির রাজনীতিতে নতুন বিভেদের উৎস হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















