তামিলনাড়ুর নীলগিরি পাহাড়ে একের পর এক চা-বাগান ভেঙে গড়ে উঠছে বিলাসবহুল বাংলো ও আবাসন প্রকল্প। জলবায়ু পরিবর্তন, চায়ের দরপতন এবং কোভিড-পরবর্তী রিয়েল এস্টেট চাহিদা—এই তিনের সমন্বয়ে ‘ব্লু মাউন্টেনস’-এর ভূদৃশ্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই রূপান্তর ভঙ্গুর পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত।
কুনুরের ইয়েদাপল্লিতে সিলভার ওক গাছের মাথা ছাপিয়ে এখন উঁকি দেয় প্রাসাদোপম বাড়ি। যে বিস্তীর্ণ চা-বাগানে একসময় সীমিত জনবসতি ছিল, তা ছোট ছোট প্লটে বিক্রি হয়ে রূপ নিয়েছে হলিডে হোম ও হোমস্টেতে। বছরের অধিকাংশ সময় ফাঁকা পড়ে থাকে এসব বাড়ি—বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কেন ভাঙছে চা-বাগানের অর্থনীতি
ছোট ও মাঝারি বাগান মালিকদের মতে, চা-চাষ আর লাভজনক নয়। সবুজ চা পাতার দাম ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে প্রায় স্থির, অথচ ইনপুট খরচ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে অনেক বাগানে উৎপাদন প্রায় ৫০% কমেছে। হিসাব কষে বছরে এক একর থেকে ৩৫–৪০ হাজার টাকার বেশি হাতে থাকে না। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকা জমি বিক্রি করে পাহাড় ছাড়ছেন অনেকে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) ও আর্থিক সুরক্ষা না এলে বিক্রি বাড়বে—এমন সতর্কবার্তাও আছে।
আইনি জটিলতা ও প্রশাসনের অবস্থান
তামিলনাড়ু ল্যান্ড রিফর্মস আইনের ধারা ৭৩(iv) অনুযায়ী চা-বাগান হিসেবে যে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা কেবল চা চাষের জন্য। ভূমি-ব্যবহারের শর্ত ভাঙলে সরকার অধিগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ, অনেক প্রকল্প পরিকল্পনা অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে উঠেছে; পরে নিয়মিতকরণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।
নীলগিরির কালেক্টর লক্ষ্মী ভব্যা তান্নেরু জানিয়েছেন, ৯০০-র বেশি সম্ভাব্য অবৈধ নির্মাণে নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং ৭৫টির বেশি ভবন সিল করা হয়েছে। হিল এরিয়া কনজারভেশন অথরিটি (HACA) ও টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ বৈধ নয়। প্রশাসন স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে নজরদারিও জোরদার করেছে। বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাজ হাইকোর্টেও শুনানি চলছে।
পরিবেশ ও জলব্যবস্থায় প্রভাব
সংরক্ষণবিদদের মতে, চা-বাগানের পরিবেশগত মূল্য সীমিত হলেও তা পুরোপুরি কংক্রিটে বদলে দিলে ক্ষতি আরও গভীর হবে। অনেক বাগানে শোলা অরণ্যের ছোট অংশ, ঘাসভূমি ও জলাভূমি টিকে আছে, যা জলধারণ ও বন্যপ্রাণীর চলাচলে সহায়ক। নতুন আবাসন প্রকল্পে পাহাড়চূড়া ও ‘রিচার্জ এরিয়া’য় নির্মাণ হওয়ায় ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ ব্যাহত হচ্ছে। চারদিকে বেড়া দেওয়ায় বন্যপ্রাণীর আবাসভূমির সংযোগও ভেঙে যাচ্ছে।
নীলগিরি কোয়েম্বাটুর, তিরুপ্পুর ও ইরোদের মতো নিম্নাঞ্চলীয় শহরের জলাধার। পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ চললে নিম্নপ্রবাহের শহরগুলিও দীর্ঘমেয়াদে জলসংকটে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
কোভিড-পরবর্তী জমি কেনাবেচা
কোভিড লকডাউনে বহু বাইরের ক্রেতা পাহাড়ে বসতি গড়ার প্রত্যাশায় জমি কিনেছেন। আর্থিক চাপে পড়া বাগান মালিকরা কমদামে জমি বিক্রি করেছেন—বলছেন স্থানীয় রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা। পরে অনেক সম্পত্তি হোমস্টে-রিসোর্টে রূপ নেয়, যা নিয়ে আদালতের নজরদারি শুরু হয়েছে।
পরিস্থিতি এখন এক সন্ধিক্ষণে। পাহাড়ে উন্নয়ন বনাম সংরক্ষণ—এই দ্বন্দ্বে নীলগিরির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কঠোর আইন প্রয়োগ, নীতিগত সহায়তা ও পরিবেশ-সংবেদনশীল পরিকল্পনার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















