বাংলাদেশের কৃষিতে এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্ভাবিত দেশের প্রথম খরা সহনশীল সয়াবিন জাত ‘গাউ সয়াবিন’ চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে। দীর্ঘ গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে উদ্ভাবিত এই জাত ইতোমধ্যে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন পেয়েছে।
তিন বছরের গবেষণা, পাঁচ বছরের মাঠপরীক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ মান্নানের নেতৃত্বে এই সাফল্য অর্জিত হয়। প্রায় আড়াই শতাধিক জার্মপ্লাজম নিয়ে তিন বছর ধরে মূল্যায়নের পর খরা সহনশীল এই জাত নির্বাচন করা হয়। তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত উপাদানের ভিত্তিতে গবেষণা এগোয়।
পরবর্তীতে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলায় পাঁচ বছর ধরে মাঠপর্যায়ে সফল পরীক্ষা শেষে জাতটি আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত হয়।

খরাতেও টিকে থাকার অসাধারণ সক্ষমতা
গাউ সয়াবিন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জমির আর্দ্রতা থাকলেও ভালো ফলন দিতে সক্ষম। উপকূলীয় চরাঞ্চলে যেখানে অনিয়মিত বৃষ্টি ও লবণাক্ততা বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এই জাত নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
প্রতিটি গাছে ৮০ থেকে ১০০টি শুঁটি ধরে। এক হাজার বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। প্রতি হেক্টরে ফলন ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৮ টন পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় বেশি।
পুষ্টিগুণ ও পোলট্রি শিল্পে সম্ভাবনা
এই সয়াবিনে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উচ্চমানের প্রোটিন এবং ১৮ থেকে ২০ শতাংশ তেল রয়েছে। এতে থাকা প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান অপুষ্টি দূরীকরণে সহায়ক। হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে এতে ট্রিপসিনের মাত্রা কম, ফলে পোলট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণ বাড়ে। এ কারণে দেশের পোলট্রি শিল্পেও এই জাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

দ্রুত পরিপক্বতা, দ্রুত লাভ
গাউ সয়াবিন মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস দশ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। ফলে কৃষকরা স্বল্প সময়ে ফসল ঘরে তুলতে পারেন এবং একই জমিতে অতিরিক্ত আবাদ পরিকল্পনার সুযোগ পান।
অধ্যাপক ড. এম এ মান্নান বলেন, উপকূলীয় চরাঞ্চলের অনিশ্চিত আবহাওয়া ও খরাপ্রবণ মাটিতে সয়াবিন চাষ সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এই নতুন জাত সেই ঝুঁকি কমিয়ে কৃষকদের সামনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জে কে এম মোস্তাফিজুর রহমান এই উদ্ভাবনকে দেশের কৃষিতে ষষ্ঠ বিপ্লবাত্মক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















