অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন অবশেষে মুখ খুললেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। তবে তিনি নিজে ওই গোষ্ঠীর অংশ ছিলেন না এবং অনেক আলোচনাই তার অজানায় হয়েছে।
কিচেন কেবিনেটের অভিযোগ
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরে একটি আলাদা বলয় ছিল। সেখানে কী আলোচনা হতো, তা তাকে জানানো হতো না। দেশের পরিস্থিতি তখন অগ্নিগর্ভ ছিল, কিন্তু তাকে ডাকা হয়নি, পরামর্শও চাওয়া হয়নি। তার ধারণা, তিনি হয়তো তাদের মনোভাবের সঙ্গে একমত হতেন না—এমন অনুমান থেকেই তাকে দূরে রাখা হয়েছিল। কারা এই কাজ করেছেন, তারা চিহ্নিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভূমিকা ও পুলিশ পুনর্গঠন
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান লক্ষ্য ছিল পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করা। সে সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল ভঙ্গুর। একাধিক থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রায় চার হাজার রাইফেল লুট হয় বলে জানান তিনি।
পুলিশ সদস্যরা মাঠে নামতে অনাগ্রহী ছিলেন। তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করা হয়। ট্রাফিক পুলিশও দায়িত্বে ফিরতে চাইছিল না, পরে তাদেরও কাজে ফেরানো হয়। কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা গেলেও এখনও হাজারের বেশি রাইফেল ও পিস্তল লুট অবস্থায় রয়েছে বলে তিনি জানান। তার মতে, এটি বর্তমান সরকারের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
হঠাৎ অপসারণ কেন
কেন তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, সে সময় কিছু মন্তব্য করেছিলেন যা তখন গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তবে এখন আরও গুরুতর ঘটনা ঘটছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। গণমাধ্যমে তার বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল বলেও দাবি করেন। তিনি নিজে সরে যেতে চাইলেও প্রধান উপদেষ্টা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে যেতে দেননি, কারণ এতে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারত।

৭.৬২ বুলেট ও টাইপ ৩৯ রাইফেল বিতর্ক
৭.৬২ ক্যালিবারের চাইনিজ টাইপ ৩৯ রাইফেল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলেন সাখাওয়াত। তার দাবি, এই অস্ত্র সাধারণত সমরাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং পুলিশের হাতে থাকার কথা নয়। তিনি ভিডিও ফুটেজে এমন কিছু ব্যক্তিকে দেখেছেন, যারা লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে হেলমেট লাগিয়ে পুলিশের রাইফেল ব্যবহার করছে। তাদের চেহারা ও গঠন সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই অস্ত্র পুলিশকে কবে ও কেন দেওয়া হলো, তা নিয়ে তদন্ত করার ইচ্ছা ছিল তার। তবে দায়িত্বে না থাকায় তা সম্ভব হয়নি বলে জানান। তার মতে, পুরো বিষয়টির পেছনের প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করা জরুরি।
নির্বাচন নিয়ে অবস্থান
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও শতভাগ নির্ভুল নির্বাচন হয় না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনকে তিনি মোটামুটি ভালো বলে আখ্যা দেন। জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পাওয়াকে তিনি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখেন। তার মতে, আগের তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগই পায়নি—সেই প্রেক্ষাপটে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
চুক্তি ও গোপনীয়তার প্রশ্ন
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, কোনো অপ্রকাশিত চুক্তি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সংস্থার মাধ্যমে নিয়ম মেনেই চুক্তি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ‘নন-ডিসক্লোজার’ ধারা থাকে, যা আন্তর্জাতিক চর্চার অংশ।
আমেরিকান কোম্পানি ও ৪ শতাংশ তহবিল বিতর্ক

একটি মার্কিন কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে ৪ শতাংশ অবদানের প্রশ্নে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়েছিল। তার যুক্তি ছিল, উন্নত প্রযুক্তির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। অফশোর প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে, যা চীনের কাছে নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে হার ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১.৫ শতাংশে সমঝোতা হয়।
বিদেশি প্রভাব ও বাণিজ্য চাপ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদেশি প্রভাব ছিল কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সর্বক্ষেত্রে নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে চাপ ছিল। বিশেষ করে বাণিজ্য আলোচনায় বড় ধরনের চাপ অনুভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
পররাষ্ট্র নীতি ও ‘দিল্লি-কেন্দ্রিকতা’
পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে নীতি অনেকটা দিল্লি-কেন্দ্রিক ছিল। তার মতে, রক্তক্ষয়ী ঘটনার সময় বহু সিদ্ধান্ত দিল্লি থেকে প্রভাবিত হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সেখানে অবস্থান করে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















