ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামোতে দ্রুত পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এই শূন্যতার মুহূর্তে নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষে উঠে এসেছেন প্রবীণ রাজনীতিক আলি লারিজানি। তিনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হবে।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে লারিজানি আবারও ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন।
নিরাপত্তা ও কূটনীতির কেন্দ্রে লারিজানি
গত বছরের বিমানযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন লারিজানি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি খামেনির ঘনিষ্ঠ অনুগত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী অংশের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক বজায় রাখার দক্ষতাও দেখিয়েছেন।
পারমাণবিক আলোচনা থেকে শুরু করে তেহরানের আঞ্চলিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার প্রস্তুতি নিতে তিনি সম্প্রতি ওমানে সফর করেন। পাশাপাশি মস্কো সফরের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করেন।
পারমাণবিক ইস্যুতে বাস্তববাদী অবস্থান
লারিজানি মনে করেন, পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান সম্ভব। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যদি উদ্বেগ থাকে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের পথে যাবে, তবে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যায়।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। একবার কোনো প্রযুক্তি অর্জিত হলে তা মুছে ফেলা যায় না—এমন বক্তব্যও দিয়েছেন তিনি।
২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে কাজ করেন লারিজানি। পরে সংসদের স্পিকার হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়েই বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে আসে।

বিক্ষোভ দমন ও বিতর্ক
চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তার ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং অভিযোগ তোলে যে তিনি কঠোর দমন-পীড়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, বিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষ নিহত হয়। লারিজানি যদিও অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে জনগণের ক্ষোভকে আংশিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তবে সশস্ত্র তৎপরতাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেন।
রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
লারিজানি একাধিকবার রাশিয়া সফর করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় মস্কোকে গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যকারী শক্তি হিসেবে দেখেন তিনি।
এছাড়া চীনের সঙ্গে ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি এগিয়ে নিতে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে ইরান পূর্বমুখী কৌশল আরও জোরদার করে।
![]()
পারিবারিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি পরে ইরানে বড় হন। দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পরিবার দেশের প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবারগুলোর একটি। ভাইয়েরা বিচার বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
তিনি একাধিকবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলেও অভিভাবক পরিষদের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে বাদ পড়েন।
নতুন বাস্তবতায় ক্ষমতার রূপান্তর
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদের ঘোষণা দিয়ে লারিজানি আপাতত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি কূটনৈতিক তৎপরতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক কৌশল—এই তিন ক্ষেত্রেই সক্রিয় রয়েছেন। ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে তার কৌশল ও সিদ্ধান্তের ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















