২০১৯ সালে হংকংয়ের মানুষ বিপুল সংখ্যায় রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল একটি প্রত্যর্পণ বিলের বিরোধিতা থেকে, যা অনেকের মতে আইনের শাসনকে দুর্বল করে দিত। পরে এই আন্দোলন রূপ নেয় পুলিশি সহিংসতার বিরুদ্ধে গণপ্রতিবাদে। সেই সময় পুলিশ সাবওয়েতে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করছিল এবং সাংবাদিকদের দিকেও রাবার বুলেট ছুড়ছিল। পাশাপাশি মানুষ তাদের প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার জন্যও লড়াই শুরু করে।
এই আন্দোলন দ্রুতই হংকংয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলনে পরিণত হয়। সরকারের অনড় অবস্থানে হতাশ হয়ে কিছু কর্মী আরও কঠোর কৌশল গ্রহণ করেন। ফলে টিয়ার গ্যাসের সঙ্গে মলোটভ ককটেলের ধোঁয়াও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল ১৯৮৯ সালে বেইজিংকে কেন্দ্র করে হওয়া গণআন্দোলনের পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সামনে সবচেয়ে বড় দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ।
২০২০ সালে এই তুলনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে, যখন হংকং কার্যত সামরিক আইনসদৃশ নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যায়। যদিও সেখানে গণহত্যা হয়নি এবং সেনাবাহিনীর বদলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু প্রধান কর্মীদের কেউ নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন, কেউ কারাগারে যান। পাশাপাশি বেইজিং কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইন চাপিয়ে দেয়, যা ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দেয়। এতে অনেকের কাছে মনে হয়, যেন ৩০ বছর পর তিয়ানআনমেনের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটছে—একদিকে গণতান্ত্রিক আশার সময়, রাস্তায় লাখো মানুষের মিছিল; অন্যদিকে পরে কঠোর দমননীতি এবং শুধু সরকারপন্থী সমাবেশের অনুমতি।
১৯৮৯ সালের বেইজিং ও ২০১৯ সালের হংকংয়ের পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্যে স্পষ্ট মিল থাকলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সম্প্রতি আমরা দুজনেই হংকং সফরে গিয়ে এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি। এই পার্থক্য আসলে দেখায়, স্বৈরশাসিত সরকারগুলো কীভাবে জনআন্দোলনের স্মৃতি ও দমন-পীড়নের ইতিহাসকে সামাল দেয়।

ইতিহাস মোকাবিলার দুটি পথ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে—মেক্সিকোতে ১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলন, সাম্প্রতিক মিয়ানমার, ১৯৪৭ সালের তাইপেই কিংবা সাম্প্রতিক তেহরান—স্বৈরশাসিত সরকারগুলো সাধারণত দুটি পথের একটি বেছে নেয়। হয় তারা দাবি করে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, অথবা তারা ঘটনাটির ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়।
অর্থাৎ রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—ঐতিহাসিক ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা ও উপস্থাপন সম্পূর্ণ বন্ধ করবে, নাকি আলোচনা চলতে দেবে কিন্তু এমন একটি সংস্করণ প্রতিষ্ঠা করবে যেখানে প্রতিবাদকারীদের খাটো করা হবে এবং তাদের দমনকারীদের নায়ক হিসেবে তুলে ধরা হবে।
১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন আন্দোলনের পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কিছু সময় দ্বিতীয় পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত প্রথম পথই বেছে নেয়—সম্পূর্ণ মুছে ফেলা। বিখ্যাত “ট্যাঙ্ক ম্যান” ছবিটিকে পর্যন্ত নিষিদ্ধ প্রতীকে পরিণত করা হয়। কিন্তু হংকংয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অন্য পথ নিয়েছে—ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো।
হংকং জাদুঘরে ইতিহাসের নতুন গল্প
২০১৯ সালের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শীতল উদাহরণ দেখা যায় হংকং ইতিহাস জাদুঘরে। এখন সেখানে ভ্রমণ শুরু হয় “জাতীয় নিরাপত্তা প্রদর্শনী গ্যালারি” দিয়ে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধভাবে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে।
এই প্রদর্শনী তৈরি করা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারির পঞ্চম বার্ষিকী উপলক্ষে। এর লক্ষ্য আইনটির ব্যাখ্যা দেওয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—এটিকে উদযাপন করা। বেইজিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল, ২০১৯ সালের মতো আর কোনো আন্দোলন যেন না হয়। সেই অর্থে এই আইন হংকংয়ের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতীক, আর প্রদর্শনীটি সেই প্রক্রিয়ার সমাপ্তির প্রমাণ।

২০২০ সালের আগে এই জাদুঘর হংকংয়ের স্বতন্ত্র ইতিহাস ও প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজকে তুলে ধরত। এমনকি এখানে ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন আন্দোলনের প্রতি হংকংবাসীর সমর্থনের উল্লেখও ছিল—যা ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একমাত্র জাদুঘরভিত্তিক ইঙ্গিত।
কিন্তু বর্তমান প্রধান প্রদর্শনীতে জোর দেওয়া হয়েছে একটি একীভূত জাতীয় ইতিহাসের ওপর। প্রদর্শনী কক্ষগুলোতে জাতীয় পতাকা ও নানা ঐতিহাসিক বস্তু সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যেন বোঝানো যায় হংকং সব সময়ই চীনের অংশ হওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল এবং এখন তা দৃঢ়ভাবে চীনের সঙ্গে একীভূত।
এখানে তিয়ানআনমেনের কোনো উল্লেখ নেই। ২০১৯ সালের আন্দোলনকে অপমানজনকভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং দমন অভিযানকে শহরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে দাবি করা হয়েছে, বিদেশি শক্তির মদদে একটি “রঙিন বিপ্লব” প্রায় হংকংকে ধ্বংস করে ফেলেছিল।
প্রদর্শনীতে রাস্তার সংঘর্ষের ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে বেছে বেছে জনতার সহিংসতা দেখানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশের সহিংসতা—যা বাস্তবে আরও ব্যাপক ছিল—তা একেবারেই দেখানো হয়নি। আইনটির প্রয়োজনীয়তা এবং তা প্রয়োগের জন্য তৈরি নতুন কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
দর্শনার্থীদের সতর্ক থাকতে এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড কর্তৃপক্ষকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া লেখা রয়েছে ফলকে। এটি কার্যত নজরদারি রাষ্ট্রের সরাসরি প্রচার।
নতুন যুগে ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ
এই গ্যালারির বিশেষত্ব হলো, জাতীয় নিরাপত্তা আইনের যে দিকগুলো বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে সর্বগ্রাসী শাসনের ইঙ্গিত দেয়, সেগুলো লুকানোর চেষ্টা করা হয়নি। বরং প্রকাশ্যেই প্রদর্শন করা হয়েছে।

ডিজিটাল যুগে পুরোপুরি ইতিহাস মুছে ফেলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাই অনেক স্বৈরশাসক এখন অন্য কৌশল নিচ্ছে—ইতিহাসের বর্ণনাকে প্রকাশ্যেই নিজেদের লক্ষ্য অনুযায়ী নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়া। জাদুঘরগুলো হয়ে উঠছে সেই গল্প তৈরির জায়গা, যেখানে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত ইতিহাস সাজানো ও স্থায়ী করা হয়।
বিশ্বের অন্য জায়গাতেও এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনের মারিউপোল দখলের পর সেখানে একটি জাদুঘর চালু করেছে, যেখানে যুদ্ধের ঘটনাগুলো নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নতুন বাস্তবতার প্রতীক
জাদুঘরের প্রবেশদ্বার থেকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রদর্শনীর পথে একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে—“হংকং স্টোরি” নামে পুরোনো প্রধান গ্যালারি সংস্কারের জন্য বন্ধ আছে এবং পরে আবার খোলা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি আবার খোলার সম্ভাবনা খুবই কম।
বরং সম্ভবত জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রদর্শনীই নতুন তথ্য যোগ করে হালনাগাদ করা হবে। সেখানে হয়তো যোগ হবে জিমি লাইয়ের বিরুদ্ধে দেওয়া কঠোর ২০ বছরের সাজা—যা তার বয়স ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিলে কারাগারেই মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জিমি লাইয়ের পাশাপাশি জোশুয়া ওয়ং ও গুইনেথ হোর মতো রাজনৈতিক বন্দিদের সাজা এবং বর্তমান হংকংয়ে আদালতের রায় নিয়ে আগের মতো তীব্র গণমাধ্যম বিতর্কের অনুপস্থিতি—সবই নতুন বাস্তবতার প্রতীক।
এদিকে জাদুঘরে বাসভর্তি স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে গিয়ে মূল ভূখণ্ডের ধাঁচে দেশপ্রেমের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে তাদের অভিভাবকদের টেলিভিশনে জিমি লাইয়ের রায় নিয়ে এমন গল্প শোনানো হচ্ছে, যার উদ্দেশ্যও একই।
২০১৯ সালের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে যদি কারও মনে থাকে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া, আহত মানুষ এবং পুলিশের কঠোর অভিযান—তবু এখন তাদের বারবার বলা হচ্ছে সেই বছরের একমাত্র শিক্ষা হলো এই যে, জিমি লাইয়ের মতো ব্যক্তিরা নাকি একটি প্রিয় শহরকে বিপদের মুখে ফেলেছিল। আর সেই সময় বহু পুলিশ কর্মকর্তা তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হয়েছিল, কারণ তখন তাদের পাশে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের মতো শক্ত সমর্থন ছিল না।
ভিক্টোরিয়া জোনস ও জেফ্রি ওয়াসারস্ট্রম 



















