ভারতে চলতি মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বৃষ্টির অগ্রগতি আশানুরূপ না হওয়ায় দেশজুড়ে বৃষ্টির ঘাটতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। স্বাভাবিক সময় পেরিয়ে গেলেও মৌসুমী বায়ু এখনও মুম্বাইয়ে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। এর ফলে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশব্যাপী বৃষ্টির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মহারাষ্ট্র, কনকন উপকূল ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এসব অঞ্চলে মৌসুমী বায়ুর অগ্রগতি কয়েক দিন ধরে কার্যত থমকে রয়েছে। ফলে কৃষিকাজ, বিশেষ করে খরিফ মৌসুমের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মধ্য ভারতে সংকট সবচেয়ে বেশি
সাম্প্রতিক আবহাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম ভারত ছাড়া দেশের প্রায় সব অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম ভারতে বৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে ৪৩ শতাংশ, মধ্য ভারতে ৬১ শতাংশ এবং দক্ষিণ উপদ্বীপ অঞ্চলে ১৪ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষি প্রস্তুতি পর্যালোচনা বৈঠকে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলোকে কম বা অসম বৃষ্টিপ্রবণ জেলাগুলো চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ফসলভিত্তিক বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া যায়।

বিশেষ নজরদারিতে শতাধিক জেলা
বৃষ্টির ঘাটতির ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জেলাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে এল নিনো পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে তুলা ও ডাল জাতীয় ফসল চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের দাবি, বীজ ও সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এছাড়া জলাধারগুলোতেও আগের অনেক এল নিনো বছরের তুলনায় বেশি পানি সংরক্ষিত আছে। ফলে পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশ আগের তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এল নিনোর প্রভাব নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা
এ বছর বৈশ্বিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষকরা শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনার বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন। এল নিনো সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটি ভারতীয় মৌসুমী বৃষ্টিকে দুর্বল করতে পারে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, জুন মাসের বৃষ্টির ঘাটতি সব সময় পুরো মৌসুমের ফলাফল নির্ধারণ করে না। কিছু বছর জুনে ভালো বৃষ্টি হলেও পরে খরা দেখা দিয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে জুনে ঘাটতি থাকলেও পরবর্তী মাসগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

কেন থেমে গেল মৌসুমী বায়ু?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর মৌসুমী বায়ু কেরালায় পৌঁছাতে মাত্র কয়েক দিনের দেরি হলেও পরবর্তী অগ্রগতি দুর্বল হয়ে পড়ে। মুম্বাইয়ের উত্তরে একটি প্রতিচক্রীয় বায়ুপ্রবাহ এবং পশ্চিম দিকের আবহাওয়াজনিত প্রভাব মৌসুমী বায়ুর বিস্তার বাধাগ্রস্ত করেছে।
এ ছাড়া বায়ুমণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া ব্যবস্থা বর্তমানে এমন অবস্থায় রয়েছে, যা মৌসুমী বৃষ্টির জন্য অনুকূল নয়। ফলে মুম্বাইয়ে মৌসুমী বায়ুর আগমন আরও পাঁচ থেকে ছয় দিন পিছিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য নিম্নচাপ তৈরি হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
আগাম পূর্বাভাস আরও সতর্ক
চলতি মৌসুমের শুরুতে যে পরিমাণ বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, পরে তা আরও কমিয়ে আনা হয়েছে। সর্বশেষ মূল্যায়নে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। ফলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য উৎপাদন নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
মৌসুমী বৃষ্টির পরবর্তী অগ্রগতি এখন দেশের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















