উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন সম্প্রতি নতুন নির্মিত একটি ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ পরিদর্শন করেছেন এবং সেখান থেকে একটি “কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র” পরীক্ষার তদারকি করেছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ পিয়ংইয়ংয়ের সামুদ্রিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ এবং দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ইরান সংঘাত এবং আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়ার প্রেক্ষাপটেও এই প্রদর্শন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
নতুন ডেস্ট্রয়ার ‘চোয়ে হিয়ন’ পরিদর্শন
প্রায় ৫ হাজার টন ওজনের নতুন ডেস্ট্রয়ার ‘চোয়ে হিয়ন’ যুদ্ধজাহাজে দুই দিনের সফরে যান কিম জং উন। এই সফরের সময় তিনি জাহাজটির সমুদ্র পরীক্ষা বা ট্রায়াল পর্যবেক্ষণ করেন এবং জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরীক্ষাও দেখেন।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, জাহাজটির প্রথম সমুদ্র পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কিম এই যুদ্ধজাহাজকে দেশের “সমুদ্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতার নতুন প্রতীক” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়া আরও শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলবে এবং স্থলভিত্তিক শক্তির পাশাপাশি নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিনেও পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
কিম বলেন, পানির নিচে ও পানির উপর থেকে আক্রমণ চালানোর জন্য নৌবাহিনীর সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। তিনি দাবি করেন, নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার কাজ সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সতর্ক বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক প্রদর্শনের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং যুক্তরাষ্ট্রকে একটি কৌশলগত বার্তা দিতে চেয়েছে। তাদের মতে, সমুদ্রপথ থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা থাকলে এখন তা আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের গবেষক হং মিন বলেন, কিম জং উনের বক্তব্যে স্পষ্ট যে তিনি সাম্প্রতিক ইরান সংঘাত এবং মার্চের ৯ তারিখে শুরু হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন।
তার মতে, কিম মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিতে চেয়েছেন যেন তারা পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়াকে ইরানের মতো দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা না করে।
তিনি বলেন, এই বার্তা যুক্তরাষ্ট্রকে সমুদ্রপথে হামলার মতো বিকল্প নিয়ে ভাবতে নিরুৎসাহিত করতে পারে, যেমনটি ইরানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
সামরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল
উত্তর কোরিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়াং মু জিনের মতে, কিমের সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকাণ্ড মূলত দলের কংগ্রেসে ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ। তবে ডেস্ট্রয়ার থেকে কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ স্পষ্টভাবে শক্তি প্রদর্শনের ইঙ্গিত দেয়।
তার মতে, সময় নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। ইরান পরিস্থিতি এবং আসন্ন যৌথ সামরিক মহড়ার আগে এটি উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি কৌশল।

নৌবাহিনীতে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, কিম জং উন জাহাজটির বিভিন্ন কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করেন। এসব পরীক্ষার মধ্যে জাহাজের চলাচল ও কৌশলগত সক্ষমতা যাচাইও ছিল।
এছাড়া পশ্চিম উপকূলে নামপো শিপইয়ার্ডে নির্মাণাধীন আরেকটি একই শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারও পরিদর্শন করেন তিনি। কিম বলেন, আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় প্রতি বছর অন্তত দুইটি ‘চোয়ে হিয়ন’ শ্রেণির বা তার চেয়েও উন্নত যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা উচিত।
উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীর নতুন লক্ষ্য
দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীকে দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক নৌবহরের তুলনায় দুর্বল ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে মনে করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন পিয়ংইয়ং উপকূল রক্ষার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে নৌবাহিনীর ভূমিকা বিস্তৃত করতে চায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার
উত্তর কোরিয়া একই সঙ্গে তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশল নথিতে উত্তর কোরিয়াকে এমন একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখান থেকে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক হামলার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, যখন পারমাণবিক অস্ত্র “উন্মাদ মানুষের হাতে” থাকে, তখন খারাপ কিছু ঘটতেই পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও নতুন যুদ্ধজাহাজ পরিকল্পনা
গত অক্টোবরেও উত্তর কোরিয়া সমুদ্র থেকে স্থলভাগে আঘাত হানতে সক্ষম কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়। তখন এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলনে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়া সফরের আগে ট্রাম্প কিমের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক লি ইল উ বলেন, বাস্তব যুদ্ধে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
গত বছর জুনে উত্তর কোরিয়া ‘কাং কন’ নামে আরেকটি ৫ হাজার টন ডেস্ট্রয়ার চালু করে, যদিও প্রথম উৎক্ষেপণের সময় সেটি উল্টে গিয়েছিল। পিয়ংইয়ং জানিয়েছে, একই শ্রেণির আরও একটি যুদ্ধজাহাজ ২০২৬ সালের অক্টোবরের মধ্যে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া গত ডিসেম্বরে উত্তর কোরিয়া তাদের প্রথম পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন নির্মাণের অগ্রগতি প্রকাশ করে। প্রায় ৮ হাজার ৭০০ টন ওজনের এই সাবমেরিনকে কিম “যুদ্ধ প্রতিরোধ ক্ষমতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করেন।
পরিদর্শনের সময় কিম বলেন, নতুন জাহাজ ও সাবমেরিন নির্মাণ নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতায় বড় ধরনের উন্নতি আনবে। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন যে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজাহাজ দ্রুত নির্মাণ করা হবে এবং সেগুলোকে নানা ধরনের আক্রমণাত্মক অস্ত্র ব্যবস্থায় সজ্জিত করা হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















