ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ থামাতে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে বাধ্য করার একটি প্রস্তাব মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নাকচ হয়েছে। ভোটাভুটিতে দেখা যায়, প্রায় সব রিপাবলিকান সদস্য এবং কয়েকজন ডেমোক্র্যাট একসঙ্গে এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রতি প্রাথমিক রাজনৈতিক সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটে ২১৯–২১২ ব্যবধানে একটি দ্বিদলীয় প্রস্তাবের আলোচনা আটকে দেওয়া হয়। ওই প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
ভোটের ফলাফল মূলত দলীয় লাইনে হলেও দুই দলের মধ্যেই কিছু ভিন্নমত দেখা যায়। চারজন ডেমোক্র্যাট নিজ দলের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে দুইজন রিপাবলিকান দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার এবং আইনসভাকে উপেক্ষা করার ঝুঁকি রয়েছে।

যুদ্ধ ঘোষণার সাংবিধানিক ক্ষমতা
কেন্টাকির রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি, যিনি প্রস্তাবটির প্রধান উদ্যোক্তা, প্রতিনিধি পরিষদের বিতর্কে নিজের দলের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, সংবিধান স্পষ্টভাবে যুদ্ধ শুরুর ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে দিয়েছে।
তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রো খানার সঙ্গে যৌথভাবে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। ম্যাসি জানান, ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কেবল তিনটি পরিস্থিতিতে একতরফাভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারেন—যদি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়, কংগ্রেস নির্দিষ্টভাবে অনুমোদন দেয়, অথবা যুক্তরাষ্ট্রে হামলার ফলে জাতীয় জরুরি অবস্থা তৈরি হয়।
তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই তিনটির কোনোটিই ঘটেনি।
ডেমোক্র্যাটদের প্রশ্ন
ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের গোপন ব্রিফিংয়ের পর ডেমোক্র্যাট নেতারা বলেন, প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা যথেষ্টভাবে প্রমাণ করা হয়নি।
প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস বলেন, মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এমন কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি কি ছিল, যার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার জরুরি ছিল? প্রশাসন এমন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। এমনকি তাদের যুদ্ধসংক্রান্ত নোটিফিকেশনেও ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ শব্দটি উল্লেখ নেই।

রিপাবলিকানদের পাল্টা যুক্তি
অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতারা দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আইনগতভাবেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করার অধিকার রাখেন।
পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান ব্রায়ান মাস্ট বলেন, ইরান গত চার দিন, চার মাস বা চার বছর নয়—গত ৪০ বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে।
তার ভাষায়, ইরানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে হাজারো আমেরিকান প্রাণ হারিয়েছে এবং এই পরিস্থিতি থামাতেই হবে। তারা কখনো আগাম সতর্কতা দিয়ে হামলা চালায় না, তাই ইরানকে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবেই দেখা উচিত।
সিনেটেও একই ধরনের ভোট
এই ভোটের আগের দিন মার্কিন সিনেটেও প্রায় একইভাবে দলীয় বিভাজনের ভিত্তিতে একটি প্রস্তাব আটকে দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাবের লক্ষ্যও ছিল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে বাধ্য করা।

দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা নিয়ে কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টদের মধ্যে বহু দশক ধরে মতবিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন প্রশাসন সামরিক সিদ্ধান্তে নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং অনেক সময় আইনসভা তাতে খুব বেশি বাধা দেয়নি। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ভোটে ভিন্নমত
থমাস ম্যাসির পাশাপাশি ওহাইওর রিপাবলিকান প্রতিনিধি ওয়ারেন ডেভিডসনও প্রস্তাবটি আলোচনার পক্ষে ছিলেন।
অন্যদিকে চারজন ডেমোক্র্যাট—টেক্সাসের হেনরি কুয়েলার, মেইনের জ্যারেড গোল্ডেন, ওহাইওর গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এবং ক্যালিফোর্নিয়ার হুয়ান সি ভার্গাস—নিজ দলের অবস্থান থেকে সরে এসে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।
রাজনীতিতে অবস্থানের পরিবর্তন
ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। আগে অনেক রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের কংগ্রেসকে পাশ কাটানোর সমালোচনা করলেও এখন তাদের অনেকেই বলছেন, ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপক ক্ষমতা রাখেন।
২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লিবিয়ায় বিমান হামলা শুরু করলে রিপাবলিকানরাই তার অন্যতম বড় সমালোচক ছিলেন। তখন রিপাবলিকানরা ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের দাবিতে একটি প্রস্তাবও পাস করিয়েছিলেন। সেই সময় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও বিভাজন ছিল—কেউ প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করেছিলেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন।
এখন পরিস্থিতি উল্টো, এবং বেশিরভাগ আইনপ্রণেতা দলীয় অবস্থান অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করছেন।
যুদ্ধের কৌশলগত গুরুত্ব
প্রস্তাবের বিরোধিতা করা অনেক রিপাবলিকান সদস্য এই সংঘাতের কৌশলগত গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইকেল ম্যাককাউল বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা মধ্যপ্রাচ্যকে স্থায়ী শান্তির পথে নিয়ে যেতে পারে। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসকে ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে সহায়তা করা উচিত।
ডেমোক্র্যাটদের দ্বিধা

তবে ভোটাভুটি উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতার জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে। ইসরায়েলপন্থী দুই ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি—নিউ জার্সির জশ গটহাইমার এবং ফ্লোরিডার জ্যারেড মস্কোভিটজ—প্রথমে প্রস্তাবের বিরোধিতা করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের দলের অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে একমত হয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন।
মস্কোভিটজ এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ার আগে তিনি প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ এতে তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হতে পারে বলে তার আশঙ্কা ছিল। তবে ব্যাপক ও সীমাহীন সামরিক হামলার পর তিনি মত পরিবর্তন করেন।
তার মতে, কেউ যুদ্ধ বা প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে যাই ভাবুক না কেন, যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, কংগ্রেস ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে, এবং আইনপ্রণেতারা নিজেরাই এই অবস্থার সৃষ্টি করেছেন।
অন্যদিকে জশ গটহাইমার বলেন, সিনেটে আগের দিনের ব্যর্থ ভোট পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। তার মতে, প্রতিনিধি পরিষদের প্রস্তাব এখন কেবল ইরানের ওপর প্রথম হামলার সমালোচনা নয়; বরং প্রশাসনকে এই অভিযানের লক্ষ্য, চূড়ান্ত কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়ানোর পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার আহ্বান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















