আজকের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা। ইউক্রেন থেকে ইরান—বিশ্বজুড়ে সংঘাতের ধরন বদলে দিয়েছে এই প্রযুক্তি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ড্রোন যুদ্ধের শুরুটা কোথায়? ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর সূত্রপাত প্রায় দেড় শতাব্দী আগে, এক ভিন্ন রূপে।
ভেনিস অবরোধে প্রথম প্রয়োগ
১৮৪৯ সালে অস্ট্রিয়ার বাহিনী যখন ভেনিস অবরোধ করে, তখন তারা এক অভিনব কৌশল নেয়। চালকবিহীন বেলুনে বিস্ফোরক বসিয়ে শহরের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সময় নির্ধারিত ফিউজ বা তামার তারের মাধ্যমে দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটানোর ব্যবস্থাও ছিল।
তবে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল নিয়ন্ত্রণে। বেলুনগুলো বাতাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে কিছু বেলুন ভেনিসে পৌঁছালেও অনেকগুলো উল্টো অস্ট্রিয়ার দিকেই ফিরে আসে। এই অস্ত্রগুলো চালকবিহীন হলেও আধুনিক ড্রোনের মতো নিয়ন্ত্রিত ছিল না—বরং এগুলো ছিল ভাসমান বোমা।

টেসলার রেডিও নিয়ন্ত্রণে নতুন দিগন্ত
ড্রোন প্রযুক্তির প্রকৃত অগ্রগতি ঘটে ১৮৯৮ সালে, যখন বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা রেডিও নিয়ন্ত্রিত একটি ছোট নৌযান প্রদর্শন করেন। তিনি একে বলেন “টেলিঅটোমেটন”।
এই উদ্ভাবন দেখিয়ে দেয়, দূরে বসেই যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। টেসলা কল্পনা করেছিলেন, এমন যন্ত্র ভবিষ্যতে বিস্ফোরক বহন করবে বা নজরদারির কাজে ব্যবহার হবে। যদিও সে সময় প্রযুক্তি ছিল নাজুক, ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এই ধারণা ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা যায়নি।
‘কুইন বি’ থেকে ‘ড্রোন’ নামের উৎপত্তি
১৯৩০-এর দশকে ব্রিটেন রেডিও নিয়ন্ত্রিত একটি বিমান তৈরি করে, যার নাম ছিল কুইন বি। এটি মূলত বিমানবিধ্বংসী প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার হতো।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই ‘কুইন বি’ থেকেই ‘ড্রোন’ শব্দটির উৎপত্তি। কারণ, মৌমাছির মতো এই যন্ত্রগুলোও দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দূরনিয়ন্ত্রিত বিমানের ব্যবহার আরও এগোয়। ১৯৪৪ সালের আগস্টে জো কেনেডি জুনিয়র একটি বিস্ফোরকভর্তি বোমারু বিমান নিয়ে উড্ডয়ন করেন। লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সে জার্মান স্থাপনা ধ্বংস করা।
পরিকল্পনা ছিল মাঝপথে বিমানটি দূরনিয়ন্ত্রণে দিয়ে পাইলট বের হয়ে আসবেন। কিন্তু উড্ডয়নের মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে বিমানটি বিস্ফোরিত হয়। এতে তিনি এবং তার সহ-পাইলট নিহত হন।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তি তখনও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবুও একটি ধারণা পরিষ্কার হয়ে ওঠে—মানুষ ছাড়াই দূর থেকে আঘাত হানা সম্ভব।
আধুনিক যুদ্ধের রূপ বদলে দিয়েছে ড্রোন
এক শতাব্দী পরে সেই ধারণাই এখন বাস্তব। আধুনিক ড্রোন শুধু নজরদারি নয়, সরাসরি হামলার অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ২০১০ সালে যেখানে প্রায় ৬০টি দেশের ড্রোন কর্মসূচি ছিল, এখন অন্তত ১১৮টি দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন শুধু কৌশল নয়, বরং শক্তির নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে। আর এর শিকড় লুকিয়ে আছে ইতিহাসের সেই প্রথম পরীক্ষাগুলোর মধ্যেই।
ড্রোন যুদ্ধের ইতিহাস: ১৮৪৯ ভেনিস অবরোধ থেকে আধুনিক সংঘাত
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















