শ্রমজীবী শ্রেণি—রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত শব্দ। কিন্তু যত বেশি এই শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে, ততই এর অর্থ যেন অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় যে পরিচয়টি ছিল কারখানার শ্রমিক, নির্মাণকর্মী বা মাঠে-ঘাটে কাজ করা মানুষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, আজ সেটি এমন এক ধারণায় পরিণত হয়েছে যার সীমানা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
সমস্যাটি কেবল ভাষাগত নয়; এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। আধুনিক অর্থনীতি কাজের ধরন, আয়ের উৎস এবং সামাজিক অবস্থানের ধারণাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে “শ্রমজীবী” বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হবে, সে প্রশ্নের সহজ উত্তর আর নেই।
শিল্পবিপ্লবের সময় শ্রমজীবী শ্রেণির ধারণার জন্ম। কৃষিনির্ভর জীবন থেকে মানুষ যখন কারখানাভিত্তিক উৎপাদনে যুক্ত হতে শুরু করল, তখন শ্রমজীবী বলতে বোঝানো হতো সেইসব মানুষকে যারা নিজেদের শারীরিক শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁদের জীবন সাধারণত ছিল অনিশ্চিত, কঠোর পরিশ্রমনির্ভর এবং সীমিত আর্থিক নিরাপত্তায় আবদ্ধ।
বিশ শতকে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। শ্রমিক সংগঠনগুলো শক্তিশালী হয়, মজুরি বাড়ে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায় এবং বহু শ্রমজীবী পরিবার মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে প্রবেশের সুযোগ পায়। একই সময়ে অফিসকেন্দ্রিক বা তথাকথিত ‘সাদা কলার’ চাকরির বিস্তার ঘটে। শারীরিক শ্রম কম হলেও এসব পেশায় শিক্ষা, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অগ্রগতির সুযোগ বেশি ছিল।
এই বিভাজন দীর্ঘদিন মোটামুটি স্পষ্ট ছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বিশ্বায়নের ফলে গত কয়েক দশকে শ্রমবাজারের কাঠামো আমূল বদলে গেছে। ঐতিহ্যগত শিল্পখাতে কর্মসংস্থান কমেছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সরকারি প্রশাসন এবং নানা ধরনের সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যবিত্তের নতুন ভিত্তি তৈরি হয়েছে এসব পেশাকে কেন্দ্র করে।
ফলে “শ্রমজীবী” শব্দটির অর্থ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। এটি আর মধ্যবিত্তের বৃহৎ অংশকে নির্দেশ করে না; বরং কম আয়, সীমিত নিরাপত্তা এবং অনিশ্চিত কর্মজীবনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে। কিন্তু এখানেও একটি জটিলতা রয়েছে। শারীরিক শ্রমনির্ভর অনেক পেশা আজ আগের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতানির্ভর এবং উচ্চ বেতনের। নির্মাণশিল্প, উৎপাদন খাত কিংবা পরিবহন খাতের বহু কর্মী এমন আয় করেন যা অনেক অফিসকর্মীর আয়ের চেয়েও বেশি।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কেবল শারীরিক শ্রম কি কাউকে শ্রমজীবী করে তোলে? যদি কোনো ইউনিয়নভুক্ত কর্মী উচ্চ আয়, শক্তিশালী পেনশন সুবিধা এবং স্থায়ী চাকরির নিরাপত্তা পান, তবে তাঁকে কি এখনও একই অর্থে শ্রমজীবী বলা যায়, যেভাবে কয়েক দশক আগে বলা হতো?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব কেবল একাডেমিক নয়। কারণ “শ্রমজীবী” পরিচয়টি নীতিনির্ধারণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সরকার যখন কর্মসংস্থান, মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা বা করনীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সাধারণত এমন একটি জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রাখে যারা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠী কারা, সেটিই যদি অস্পষ্ট হয়ে যায়, তবে নীতিনির্ধারণও বিভ্রান্তির মুখে পড়তে পারে।
আরও বড় পরিবর্তন সামনে অপেক্ষা করছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি মূলত শারীরিক শ্রমনির্ভর ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজকে প্রতিস্থাপন করেছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান পরিস্থিতিকে উল্টে দিতে পারে। এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে বহু অফিসকেন্দ্রিক পেশা—বিশ্লেষক, প্রশাসনিক কর্মী, হিসাবরক্ষক কিংবা অন্যান্য জ্ঞানভিত্তিক চাকরি। যেসব কাজ একসময় নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো, সেগুলোর অনেকগুলোই ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
এর ফলে এক নতুন ধরনের শ্রমজীবী শ্রেণির আবির্ভাব ঘটতে পারে। তাঁদের হাতে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকবে, তাঁরা অফিসে কাজ করবেন, কিন্তু চাকরির নিরাপত্তা কম হবে, আয় হবে তুলনামূলক অনিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকবে বেশি। অন্যদিকে দক্ষ কারিগর, নির্মাণকর্মী বা বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে আরও স্থিতিশীল ও লাভজনক অবস্থানে থাকতে পারেন।
এই বাস্তবতা আমাদের বাধ্য করছে শ্রেণি-পরিচয়ের পুরোনো সংজ্ঞাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে। শ্রমজীবী হওয়া হয়তো আর কেবল কাজের ধরন দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বরং চাকরির নিরাপত্তা, আয়ের স্থিতিশীলতা, সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকির মাত্রা—এসব বিষয়ই ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সম্ভবত সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সমাজের অর্থনৈতিক দুর্বলতা সবসময় একই জায়গায় অবস্থান করে না। একসময় যে গোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি ছিল, ভবিষ্যতে সেই প্রয়োজন অন্য কারও হতে পারে। তাই “শ্রমজীবী” শব্দটিকে একটি স্থির পরিচয় হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা দরকার।
কারণ অর্থনীতি বদলালে কাজ বদলায়, কাজ বদলালে শ্রেণির ধারণাও বদলে যায়। আর সেই পরিবর্তনকে বুঝতে না পারলে আমরা হয়তো পুরোনো নাম ব্যবহার করব, কিন্তু নতুন বাস্তবতাকে চিনতে ব্যর্থ হব।
অ্যালিসন শ্রাগার 


















