০৩:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
মুখ ধোয়ার সময় পড়ে যাওয়ার উপক্রম, কিন্তু প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার হাঁটেন—পেছনে লুকিয়ে ভিটামিন ঘাটতির সংকেত জাপানের বইপাড়ায় পর্যটনের ঢল: ভাষার বাধা, বদলাবে কি ঐতিহ্য? দক্ষিণ লেবাননে ‘বাফার জোন’ ধারণা ভ্রান্ত, শান্তির পথ নয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে ভেঙে পড়ার শঙ্কায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পশ্চিমবঙ্গ ভোট ২০২৬: প্রথম দফায় দুপুর ১টা পর্যন্ত ভোট পড়ল ৬২.১৮%, সহিংসতা ও ইভিএম সমস্যায় উত্তেজনা ময়মনসিংহ-ঢাকা রুটে ট্রাক ভাড়া ৫ হাজার টাকা বেড়েছে, যাত্রাপিছু খরচ এখন ২২ হাজারের কাছাকাছি সিলেট-শেরপুর রুটে ট্রাক ভাড়া ৫ হাজার থেকে বেড়ে ৭ হাজার টাকা নিক্কি ২২৫ সূচক ইতিহাসে প্রথমবার ৬০ হাজার ছাড়াল রাজশাহীতে ট্রাক ভাড়া ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা বেড়েছে, কৃষক-ব্যবসায়ীরা চাপে চট্টগ্রামে ট্রাক ভাড়া প্রতি ট্রিপে ভাড়া বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা

১৯২৬ সালের ব্রিটিশ সাধারণ ধর্মঘট: ১৭ লাখ শ্রমিকের ঐক্য, তবু কেন পরাজয়ের ইতিহাস

১৯২৬ সালের মে মাসের শুরুতেই ব্রিটেন যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। কয়লাখনি শ্রমিকদের মজুরি কমানো এবং কাজের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। এর জেরে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ১৭ লাখ শ্রমিক একযোগে কাজ বন্ধ করে দেন, শুরু হয় ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাধারণ ধর্মঘট।

এই ধর্মঘট শুধু শ্রমিকদের শক্তির প্রদর্শনই ছিল না, বরং শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয় এক বড় পরাজয়ের গল্পে।

ধর্মঘটের পেছনের কারণ

ব্রিটেনের অর্থনীতিতে কয়লা ছিল দীর্ঘদিনের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু ১৯২০-এর দশকে বিদেশি প্রতিযোগীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম দামে কয়লা উৎপাদন শুরু করে। ফলে ব্রিটিশ খনিগুলো আর প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিল না।

এই সংকট সামাল দিতে খনি মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি কমানো এবং কাজের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। তাদের পাশে দাঁড়ায় ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস, যা শেষ পর্যন্ত দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়।

The General Strike of 1926 with Jonathan Schneer

দেশজুড়ে অচলাবস্থা

ধর্মঘট শুরু হতেই শিল্পকারখানা, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ—সব কিছু প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ট্রেন, বাস, ট্রাম, এমনকি বন্দর কার্যক্রমও থমকে যায়।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি ব্রিটেন আগে কখনো দেখেনি।

সরকারের কড়া অবস্থান

সরকার শুরু থেকেই এই ধর্মঘটকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশকে প্রস্তুত রাখা হয়। পাশাপাশি ‘ভলান্টিয়ার’ বা স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে জরুরি পরিষেবা চালু রাখার চেষ্টা করা হয়।

সরকার প্রায় পাঁচ লাখ ধর্মঘটভঙ্গকারী নিয়োগ দেয়, যারা শ্রমিকদের জায়গায় কাজ করতে থাকে। ফলে ধর্মঘটের প্রভাব কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।

The General Strike of 1926 with Jonathan Schneer

নেতৃত্বের দ্বিধা ও কৌশলগত দুর্বলতা

শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে শুরু থেকেই এক ধরনের দ্বিধা ছিল। তারা সরকারকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করতে চায়নি। বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চেয়েছিল।

অন্যদিকে সরকার ছিল দৃঢ় এবং সুসংগঠিত। তারা আগে থেকেই ধর্মঘট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখে।

সংঘর্ষ ও উত্তেজনা

ধর্মঘট চলাকালে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও সহিংসতাও দেখা যায়, যদিও তা বড় আকারে ছড়ায়নি।

এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি করে—কেউ শ্রমিকদের পক্ষে, আবার কেউ সরকারের পাশে দাঁড়ায়।

The General Strike of 1926 with Jonathan Schneer

হঠাৎ সমাপ্তি ও হতাশা

মাত্র নয় দিনের মধ্যেই ১২ মে ধর্মঘট শেষ করে দেওয়া হয়। ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা কোনো শর্ত ছাড়াই ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন খনি শ্রমিকরা। তারা দীর্ঘ সময় লড়াই চালালেও শেষ পর্যন্ত কম মজুরি মেনে নিতে বাধ্য হন।

ইতিহাসের শিক্ষা

১৯২৬ সালের এই ধর্মঘট ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি দেখিয়েছে শ্রমিকদের ঐক্য কতটা শক্তিশালী হতে পারে, আবার একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে সেই ঐক্যও ভেঙে পড়তে পারে।

এই ঘটনার পর শ্রমিক সংগঠনগুলো বুঝতে পারে যে, জাতীয় পর্যায়ের সাধারণ ধর্মঘট রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে তারা আরও সতর্ক কৌশল গ্রহণ করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মুখ ধোয়ার সময় পড়ে যাওয়ার উপক্রম, কিন্তু প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার হাঁটেন—পেছনে লুকিয়ে ভিটামিন ঘাটতির সংকেত

১৯২৬ সালের ব্রিটিশ সাধারণ ধর্মঘট: ১৭ লাখ শ্রমিকের ঐক্য, তবু কেন পরাজয়ের ইতিহাস

০৫:১৩:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

১৯২৬ সালের মে মাসের শুরুতেই ব্রিটেন যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। কয়লাখনি শ্রমিকদের মজুরি কমানো এবং কাজের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। এর জেরে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ১৭ লাখ শ্রমিক একযোগে কাজ বন্ধ করে দেন, শুরু হয় ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাধারণ ধর্মঘট।

এই ধর্মঘট শুধু শ্রমিকদের শক্তির প্রদর্শনই ছিল না, বরং শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয় এক বড় পরাজয়ের গল্পে।

ধর্মঘটের পেছনের কারণ

ব্রিটেনের অর্থনীতিতে কয়লা ছিল দীর্ঘদিনের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু ১৯২০-এর দশকে বিদেশি প্রতিযোগীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম দামে কয়লা উৎপাদন শুরু করে। ফলে ব্রিটিশ খনিগুলো আর প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিল না।

এই সংকট সামাল দিতে খনি মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি কমানো এবং কাজের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। তাদের পাশে দাঁড়ায় ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস, যা শেষ পর্যন্ত দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়।

The General Strike of 1926 with Jonathan Schneer

দেশজুড়ে অচলাবস্থা

ধর্মঘট শুরু হতেই শিল্পকারখানা, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ—সব কিছু প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ট্রেন, বাস, ট্রাম, এমনকি বন্দর কার্যক্রমও থমকে যায়।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি ব্রিটেন আগে কখনো দেখেনি।

সরকারের কড়া অবস্থান

সরকার শুরু থেকেই এই ধর্মঘটকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশকে প্রস্তুত রাখা হয়। পাশাপাশি ‘ভলান্টিয়ার’ বা স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে জরুরি পরিষেবা চালু রাখার চেষ্টা করা হয়।

সরকার প্রায় পাঁচ লাখ ধর্মঘটভঙ্গকারী নিয়োগ দেয়, যারা শ্রমিকদের জায়গায় কাজ করতে থাকে। ফলে ধর্মঘটের প্রভাব কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।

The General Strike of 1926 with Jonathan Schneer

নেতৃত্বের দ্বিধা ও কৌশলগত দুর্বলতা

শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে শুরু থেকেই এক ধরনের দ্বিধা ছিল। তারা সরকারকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করতে চায়নি। বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চেয়েছিল।

অন্যদিকে সরকার ছিল দৃঢ় এবং সুসংগঠিত। তারা আগে থেকেই ধর্মঘট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখে।

সংঘর্ষ ও উত্তেজনা

ধর্মঘট চলাকালে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও সহিংসতাও দেখা যায়, যদিও তা বড় আকারে ছড়ায়নি।

এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি করে—কেউ শ্রমিকদের পক্ষে, আবার কেউ সরকারের পাশে দাঁড়ায়।

The General Strike of 1926 with Jonathan Schneer

হঠাৎ সমাপ্তি ও হতাশা

মাত্র নয় দিনের মধ্যেই ১২ মে ধর্মঘট শেষ করে দেওয়া হয়। ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা কোনো শর্ত ছাড়াই ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন খনি শ্রমিকরা। তারা দীর্ঘ সময় লড়াই চালালেও শেষ পর্যন্ত কম মজুরি মেনে নিতে বাধ্য হন।

ইতিহাসের শিক্ষা

১৯২৬ সালের এই ধর্মঘট ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি দেখিয়েছে শ্রমিকদের ঐক্য কতটা শক্তিশালী হতে পারে, আবার একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে সেই ঐক্যও ভেঙে পড়তে পারে।

এই ঘটনার পর শ্রমিক সংগঠনগুলো বুঝতে পারে যে, জাতীয় পর্যায়ের সাধারণ ধর্মঘট রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে তারা আরও সতর্ক কৌশল গ্রহণ করে।