চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ধীরে ধীরে উষ্ণতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভারত বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) সংক্রান্ত নিয়ম কিছুটা শিথিল করেছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য ভারতের বিভিন্ন শিল্প খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন নিয়মে বিনিয়োগ অনুমোদনের সময়সীমা
মঙ্গলবার ঘোষিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশের সঙ্গে ভারতের স্থলসীমান্ত রয়েছে সেসব দেশের বিনিয়োগ প্রস্তাব এখন ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে। এই নিয়ম মূলত মূলধনী যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক উপাদান, পলিসিলিকন এবং ইনগট ওয়েফারসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তবে বিনিয়োগের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ভারতীয় কোম্পানি বা ব্যক্তির হাতেই থাকতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত উপকারী মালিকানার অংশীদার হতে পারবেন স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন ব্যবস্থার আওতায়, যেখানে সরকারের আলাদা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

২০২০ সালের কঠোর নিয়মের পটভূমি
২০২০ সালের এপ্রিলে করোনাভাইরাস মহামারির সময় ভারত সরকার বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কঠোর নিয়ম আরোপ করেছিল। সেই সময় আশঙ্কা করা হচ্ছিল, দুর্বল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে দখল করে নিতে পারে।
এর আগে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভারতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসিতে নিজেদের শেয়ার ০.৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১.১ শতাংশে উন্নীত করলে দেশটির রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এরপরই কঠোর নিয়ম চালু করা হয়।
সরকারের মতে নতুন নীতির লক্ষ্য
ভারত সরকারের মতে, নতুন নিয়ম বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে দেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে। এর ফলে উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা বাড়বে।
সরকারের তথ্য দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে দেশীয় মূলধনের ঘাটতি পূরণ হবে, আত্মনির্ভর ভারত কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।

সরকার আরও জানিয়েছে, বিশেষ করে যেখানে বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণমূলক বা কৌশলগত অংশীদারিত্ব নেই, সেখানে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ অনেক সময় বৈশ্বিক বিনিয়োগ তহবিল, যেমন প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছিল।
চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর আগের প্রভাব
ভারত-চীন সীমান্তে সংঘর্ষের পর এসব নিয়মকে অনেকেই চীনা বিনিয়োগ সীমিত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন। এর ফলে চীনের অনেক কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চীনা গাড়ি নির্মাতা গ্রেট ওয়াল মোটর ভারতে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল করে দেয়। একইভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডির বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হয়, যদিও তারা সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটকও ২০২০ সাল থেকে ভারতে নিষিদ্ধ রয়েছে।
এছাড়া আলিবাবার অ্যান্ট গ্রুপ, শুনওয়ে ক্যাপিটাল এবং টেনসেন্ট হোল্ডিংসের মতো বড় চীনা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, যারা একসময় ভারতীয় স্টার্টআপে বড় বিনিয়োগ করত, সম্পর্ক অবনতি হওয়ার পর নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দেয়।

ভারতকে উৎপাদন কেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দেশটিকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ধরনের প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে। নতুন কারখানা স্থাপনে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
এই উদ্যোগের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভারত আইফোন উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি মার্কিন প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজিসহ বিভিন্ন চিপ নির্মাতা কোম্পানিও ভারতে কারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
ভারত-চীন বাণিজ্য ঘাটতি
চীনা বিনিয়োগের ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি এখনও বড় আকারে রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ভারত চীনে প্রায় ১৫.৮৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

অন্যদিকে একই সময়ে চীন থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১০৮.১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বিশেষ করে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, কম্পিউটার, সমন্বিত সার্কিট, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রাংশ, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং সার—এসব পণ্যে চীনের রপ্তানি ভারতীয় রপ্তানিকে ছাড়িয়ে গেছে।
তবুও কিছু যৌথ বিনিয়োগ
সব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ভারত কিছু চীনা সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ অনুমোদন দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী জেএসডব্লিউ গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চীনের এসএআইসি মোটরের মালিকানাধীন এমজি মোটরের ভারতীয় কার্যক্রমে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদারিত্ব কিনেছে।
এছাড়া ভারতীয় ইলেকট্রনিক্স নির্মাতা ডিক্সন টেকনোলজিস চীনা প্রতিষ্ঠান এইচকেসি ওভারসিজের সঙ্গে ডিসপ্লে মডিউল উৎপাদনের যৌথ উদ্যোগ শুরু করেছে। একইভাবে লংচিয়ার ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও ব্যক্তিগত কম্পিউটার তৈরির আরেকটি যৌথ উদ্যোগও অনুমোদন পেয়েছে।
সম্পর্কের নতুন উষ্ণতা
গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে এবং চীনা নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ নীতির এই শিথিলতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ইভান লিদারেভ এক বিশ্লেষণে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত হওয়া ভারত-চীন সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকটি আরও সক্রিয় হতে পারে।
তার মতে, চীনের জন্য ভারত একটি বড় ও দ্রুত বিকাশমান বাজার, যেখানে চীনা সরবরাহ শৃঙ্খলের কিছু অংশ ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে দেশের অর্থনৈতিক উত্থানের জন্য চীনা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সম্পর্কের উন্নতি এখনও নতুন এবং অনিশ্চিত হওয়ায় চীনা বিনিয়োগকারীরা তাড়াহুড়ো করে বড় বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আগে পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















