ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে বড় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়ে বা হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারে।
তেলের দামে হঠাৎ উল্লম্ফন
সংঘাত শুরুর মাত্র ছয় দিনের মধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে। এই দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু যুদ্ধের আশঙ্কাই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়তে থাকা উদ্বেগও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি অনেককে ১৯৭০–এর দশকের বড় তেল সংকটের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি তখনকার তুলনায় অনেক বেশি আন্তঃনির্ভরশীল এবং জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় এর প্রভাব আরও বড় হতে পারে।

বিশ্ব তেলের বাজারের বর্তমান অবস্থা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১০২ থেকে ১০৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে দৈনিক সরবরাহ রয়েছে প্রায় ১০১ থেকে ১০২ মিলিয়ন ব্যারেল। অর্থাৎ সংকট শুরু হওয়ার আগেই বিশ্ব বাজারে তেলের উদ্বৃত্ত ছিল খুবই সীমিত। ফলে সামান্য বিঘ্নও বাজারকে বড় অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আরব উপসাগরীয় অঞ্চল বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। এই অঞ্চলের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন ৩০ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল উৎপাদন করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল রপ্তানি করে। সমুদ্রপথে বিশ্ব তেল বাণিজ্যের প্রায় এক–তৃতীয়াংশই এখান থেকে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎপাদক দেশ। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। তবে বর্তমান সংকটে শুধু উৎপাদন নয়, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ দেশটি হরমুজ প্রণালীর ওপর কৌশলগত প্রভাব রাখে।
হরমুজ প্রণালী: বিশ্বের জ্বালানি সড়ক

প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও কনডেনসেট হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক–পঞ্চমাংশের সমান।
এ ছাড়া কাতারের মতো বড় রপ্তানিকারক দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
যদি এই সরু জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক ও কাতারের তেল রপ্তানির বড় অংশই থমকে যেতে পারে। এতে বিশ্ব সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি প্রণালী আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব বাজার প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ হারাতে পারে। আধুনিক তেল বাজারের ইতিহাসে এত বড় ধাক্কা খুবই বিরল।
কেন দ্রুত বাড়ছে তেলের দাম
অল্প সময়ের মধ্যে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, সামরিক পরিস্থিতির কারণে ইরানের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং সমুদ্রপথে চলাচলেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজের বিমা খরচ দ্রুত বেড়ে গেছে। ফলে অনেক কোম্পানি যাত্রা স্থগিত বা বিলম্বিত করছে।
![]()
তৃতীয়ত, আর্থিক বাজারের প্রতিক্রিয়া। বড় আন্তর্জাতিক সংকটের সময় বিনিয়োগকারী ও বড় তহবিলগুলো সাধারণত ভবিষ্যৎ তেলের চুক্তি কিনতে শুরু করে, যাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়। এতে দাম আরও দ্রুত বাড়ে।
চতুর্থত, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কিছু দেশ সাময়িকভাবে রপ্তানি কমিয়ে কৌশলগত মজুত বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নিচ্ছে।
কুয়েতের ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা
কুয়েত ইতোমধ্যে কিছু তেল বিক্রয় চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইনগতভাবে ‘ফোর্স মেজর’ এমন পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো অস্বাভাবিক কারণে কোনো দেশ বা কোম্পানি তাদের চুক্তিগত দায়িত্ব সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারে।
তেল বাজারে এই ঘোষণা বোঝায় যে সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা এখন আর শুধু অনুমান নয়, বরং বাস্তব ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
যদি উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে বিশ্ব বাজারে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম কয়েক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা
ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার অনেকের কাছে চরম পরিস্থিতি মনে হলেও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে এটি পুরোপুরি অসম্ভব নয়।
![Dólar à vista [chevron_left]brby[chevron_right] fecha em baixa de 0,59%, a r$5,3220 na venda | Reuters](https://www.reuters.com/resizer/v2/MHG23WQZTBOMNJQEQ63C3U42BA.jpg?auth=86d70463298b5736467ad6032cfa684ac4213d9ea1849272359f455e3ce2ce96&width=1920&quality=80)
ইতিহাসে এমন মূল্যবৃদ্ধির উদাহরণ রয়েছে। ১৯৭৩ সালে আরব তেল অবরোধের পর কয়েক মাসের মধ্যে তেলের দাম চার গুণ বেড়ে গিয়েছিল। আবার ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের আগে তেলের দাম প্রায় ১৪৭ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।
বর্তমানে বিশ্বে জ্বালানির চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেশি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে বড় ধরনের সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে দামের ওপর চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি উপসাগরীয় তেল অবকাঠামোর ওপর হামলা হয় বা সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত থাকে, তবে তেলের দাম ১৫০ থেকে ১৮০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আর যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দাম ২০০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কোন দেশগুলো
এই সংকটের প্রভাব সব দেশের ওপর সমানভাবে পড়বে না। কিছু বড় অর্থনীতি বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক চীন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং তাদের অনেক তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ফলে তারা সরাসরি ঝুঁকিতে থাকবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপের মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে পরিবহন ও ভারী শিল্প খাতে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট থেকে তারা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক হলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্য বাড়তে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে উপসাগরের বাইরে কিছু তেল রপ্তানিকারক দেশ, যেমন রাশিয়া, উচ্চ দামের কারণে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। তবে বিশ্ব অর্থনীতি ধীর হয়ে গেলে সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন পরীক্ষা
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির সহনশীলতার বড় পরীক্ষা।
যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয় বা হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব আবারও বড় জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে পারে। সেই সংকট অতীতের বড় তেল সংকটের মতো কিংবা তার চেয়েও গুরুতর হতে পারে।
সেই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে তেলের দাম কত বাড়বে তা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি কতদিন উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি এবং সম্ভাব্য মন্দার চাপ সহ্য করতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















