মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে এবং দরিদ্র দেশগুলোতে ক্ষুধার আশঙ্কা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সার সরবরাহে পারস্য উপসাগরের গুরুত্ব
বিশ্বের কৃষি উৎপাদনের বড় অংশ নির্ভর করে নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের ওপর। এসব সার মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয় এবং তা ফসলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। ধারণা করা হয়, বিশ্বের মোট খাদ্য উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই এই ধরনের সারের সহায়তায় আসে।
পারস্য উপসাগর অঞ্চল শুধু তেল ও গ্যাসের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এখানেই গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক সার কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হয় ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর সামুদ্রিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব সার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে খাদ্য বাজারে চাপ
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা একটি সংকীর্ণ জলপথ। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু তেল নয়, সারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে সার ও সারের কাঁচামালের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এতে কৃষকেরা জমিতে কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন, ফলে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্য সরবরাহ ও বাজারমূল্যের ওপর।
বড় উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি ঝুঁকিতে
ইরান, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন—এই পাঁচটি দেশ বৈশ্বিক ইউরিয়া বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরবরাহ করে। পাশাপাশি অ্যামোনিয়া এবং ফসফেট সারের বড় অংশও আসে এই অঞ্চল থেকে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু কারখানা উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও সেগুলো বন্দরে জমা করে রাখা হচ্ছে। কারণ সমুদ্রপথে পণ্য পাঠানো এখনো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা দীর্ঘদিন চললে মজুতের জায়গাও শেষ হয়ে যেতে পারে।

আগের যুদ্ধের মতো আবারও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা
বিশ্ব ইতিমধ্যে দেখেছে যুদ্ধ কিভাবে খাদ্য বাজারে বড় ধাক্কা দেয়। কয়েক বছর আগে ইউরোপীয় অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে গম ও শস্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং অনেক দেশে রুটির দাম বেড়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি শস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও সারের ঘাটতি কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব আগের সংকটের চেয়েও বড় হতে পারে।
সার ও কাঁচামালের দাম দ্রুত বাড়ছে
সংকটের আশঙ্কায় ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রতি টন ইউরিয়ার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া সালফার নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তেল ও গ্যাস পরিশোধনের উপউৎপাদন হিসেবে পাওয়া এই উপাদান ফসফেট সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর বড় অংশ এখন হরমুজ প্রণালীর অপর পাশে আটকে রয়েছে।
দরিদ্র দেশগুলোতে ক্ষুধার ঝুঁকি
সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ে। অনেক দেশে সরকার কৃষকদের ভর্তুকি দেয়, কিন্তু দরিদ্র অর্থনীতির দেশগুলোর পক্ষে তা বহন করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে সেখানে অপুষ্টি ও খাদ্য সংকট বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প পথের আলোচনা
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে একক অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো জরুরি। কিছু দেশে ইতিমধ্যে কৃষকদের কম আমদানি নির্ভর সার ব্যবহার করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় উপাদান দিয়ে মাটির উর্বরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব সমাধান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে। চলতি মৌসুমের ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















