রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার পথে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে ইউক্রেন। দেশটি এখন এমন ড্রোন তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে, যেগুলোতে চীনের কোনো উপাদান ব্যবহার করা হয়নি। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে ইউক্রেন এই খাতে দ্রুত স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেনের বিভিন্ন গোপন কর্মশালায় দিনরাত কাজ করছেন প্রযুক্তিবিদরা। সার্কিট বোর্ড থেকে শুরু করে নানা সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে দেশেই। কয়েক বছর আগেও যেসব প্রযুক্তি আমদানি ছাড়া সম্ভব ছিল না, এখন সেগুলোর বড় অংশ দেশীয়ভাবে তৈরি করা হচ্ছে।
যুদ্ধের ময়দানে ড্রোনের আধিপত্য
ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে এখন ড্রোন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলোর একটি। ছোট আকারের বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোনগুলো রুশ বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে।
ড্রোনের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে সাম্প্রতিক সময়ে রুশ সেনাদের হতাহতের বেশির ভাগই ঘটছে ড্রোন হামলায়। যুদ্ধের প্রথম দিকে ইউক্রেনের হাতে পর্যাপ্ত ভারী অস্ত্র ছিল না। সেই সময় তুলনামূলক সস্তা ড্রোনই তাদের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে।

চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেনের অধিকাংশ ড্রোনই চীন থেকে আসত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চীন রপ্তানিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ফলে ইউক্রেন বুঝতে পারে, বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে কিয়েভ দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা মনে করেন, আমদানির ওপর নির্ভরতা মানেই দুর্বল অবস্থান। তাই নিজেরাই ড্রোন তৈরির প্রযুক্তি গড়ে তোলাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
দেশীয় উৎপাদনে দ্রুত অগ্রগতি
যুদ্ধের প্রথম বছরে ইউক্রেনের প্রায় সব ড্রোনই বিদেশি উপাদানে তৈরি হতো। তবে ধীরে ধীরে দেশীয় উৎপাদন বাড়তে থাকে।
২০২৪ সালে সামনের সারিতে পাঠানো অধিকাংশ ড্রোন ইউক্রেনেই তৈরি হয়েছিল, যদিও সেগুলোর উপাদানের বড় অংশ ছিল চীনের। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বর্তমানে ইউক্রেনের ড্রোনে চীনা উপাদানের অংশ অনেকটাই কমে এসেছে।
স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কার্বন ফাইবার কাঠামো, অ্যান্টেনা, নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ভিডিও সম্প্রচার প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরি করছে।

গোপন কর্মশালায় প্রযুক্তির লড়াই
ইউক্রেনের একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন হাজার হাজার অ্যান্টেনা তৈরি করছে, যা ড্রোন পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, এই কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তারের অবস্থানে সামান্য বিচ্যুতিও পুরো যন্ত্রের কার্যকারিতা নষ্ট করে দিতে পারে। তাই প্রতিটি অংশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হচ্ছে।
এখন প্রতিষ্ঠানটি ড্রোনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরি করতে পারছে। কেবল ক্যামেরা প্রযুক্তি এখনও সম্পূর্ণভাবে দেশীয় হয়নি, যদিও এ ক্ষেত্রেও ইউক্রেন নতুন প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে।
শান্তি আলোচনায় কৌশলগত শক্তি
ইউক্রেন সরকার মনে করছে, দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

নিজেদের প্রযুক্তি শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতের শান্তি আলোচনায় ইউক্রেন আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। একই সঙ্গে সরবরাহের উৎস বাড়ালে কোনো দেশ এককভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না।
প্রযুক্তি যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
ইউক্রেনের প্রকৌশলীরা এখন প্রতি মাসেই ড্রোনের নকশা উন্নত করছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্রুত প্রযুক্তি পরিবর্তন করা হচ্ছে, যা প্রচলিত অস্ত্র শিল্পে খুবই বিরল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়, এটি প্রযুক্তিরও লড়াই। সেই লড়াইয়ে টিকে থাকতে ইউক্রেন এখন নিজেদের প্রযুক্তি সক্ষমতাকে দ্রুত শক্তিশালী করে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















