মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব তেলবাজার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। সংস্থাটি জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর কৌশলগত মজুদ থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংস্থার মতে, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্চে তেল সরবরাহ কমবে ৮০ লাখ ব্যারেল
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মাসিক তেলবাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে বিশ্বে দৈনিক প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এই পরিমাণ বিশ্বব্যাপী মোট চাহিদার প্রায় ৮ শতাংশের সমান।
ইরানের উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই এই সংকট তৈরি হয়।
এর আগে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তেলের বাজারে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত থাকবে বলে ধারণা করেছিল আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। তবে বর্তমান সংঘাত সেই পূর্বাভাসকে বদলে দিয়েছে।
এপ্রিল থেকে কিছুটা স্বস্তির আশা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু উপসাগরীয় দেশ বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার করে তেল সরবরাহ আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারে। ফলে সরবরাহ কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, পুরো ২০২৬ সালজুড়ে বিশ্বে তেল উৎপাদন মোট চাহিদার তুলনায় দ্রুতগতিতে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় ইরান অঞ্চলের বিভিন্ন তেল ও পরিবহন স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে। এতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরাক, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো মিলিয়ে প্রতিদিন অন্তত এক কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
যদি দ্রুত জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হয়, তাহলে এই ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
সংস্থার মতে, অনেক তেলক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কারণ কর্মী, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আবার ওই অঞ্চলে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।
সংকটময় অবস্থায় বিশ্ব জ্বালানি বাজার
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সদস্য দেশগুলোর কৌশলগত মজুদ থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, বিশ্ব জ্বালানি বাজার বর্তমানে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন বিমান সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করছে, ফলে তেলের চাহিদাও কিছুটা কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চমূল্য ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল মাসে বিশ্বে তেলের চাহিদা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল কম থাকতে পারে।
২০২৬ সালে চাহিদা বৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। নতুন হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে বৈশ্বিক চাহিদা বাড়তে পারে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল কম।
২০২৬ সালে সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি থাকতে পারে
মার্চ মাসে উৎপাদন কমলেও পুরো ২০২৬ সালে বিশ্বে তেল সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থার মতে, এ বছর বিশ্ব তেল সরবরাহ বাড়তে পারে দৈনিক প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল, যা গত মাসের পূর্বাভাসে ছিল প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৪ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল বেশি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগের প্রতিবেদনে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল।
এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহারের উদ্যোগ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, এই পদক্ষেপ এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ কিছুটা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















