মানুষের রক্তের প্রতি মশার আকর্ষণ বাড়ছে—নতুন এক গবেষণা এমনই উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দিয়েছে। গবেষকদের মতে, বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার ফলে বন্যপ্রাণী কমে যাচ্ছে, আর সেই কারণেই রোগবাহী মশা ধীরে ধীরে মানুষের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এতে ভবিষ্যতে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় কী দেখা গেল
গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্যে। সেখানে প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকায় ধরা পড়া মশাগুলোর ওপর পরীক্ষা চালান গবেষকরা। তারা আলোযুক্ত ফাঁদ ব্যবহার করে রক্তপান করা স্ত্রী মশা সংগ্রহ করেন। কারণ স্ত্রী মশাই ডিম তৈরি করার জন্য রক্ত খায়।
এরপর মশার শরীরে থাকা রক্ত থেকে ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা হয় তারা কোন প্রাণীর রক্ত পান করেছে। ফলাফল গবেষকদের অবাক করে দেয়। শনাক্ত করা ২৪টি নমুনার মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মশার শরীরে মানুষের রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়।
এই ফল আরও বিস্ময়কর কারণ পরীক্ষার কিছু ফাঁদ বনভূমির ভেতরে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে মানুষের উপস্থিতি খুবই কম।
কেন বাড়ছে মানুষের রক্তের প্রতি ঝোঁক
গবেষকদের মতে, বনভূমির চারপাশে পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার ফলে অনেক বন্যপ্রাণী কমে যাচ্ছে। সাধারণত মশা যেসব প্রাণীর রক্ত পান করে বেঁচে থাকে, সেসব প্রাণী কমে যাওয়ায় তারা নতুন বিকল্প খুঁজছে।
ফলে মশা বনভূমি থেকে উড়ে আশপাশের বসতিতে গিয়ে মানুষের রক্ত পান করছে এবং আবার বনে ফিরে যাচ্ছে—এমন সম্ভাবনাই সামনে আসছে গবেষণায়।
গবেষক ডক্টর সার্জিও মাচাদোর মতে, যদি এই প্রবণতা স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে মশা মানুষের পরিবেশেই স্থায়ীভাবে মানিয়ে নিতে পারে। তখন তাদের মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
![]()
রোগ ছড়ানোর বড় আশঙ্কা
মশা বহু বিপজ্জনক রোগের বাহক। ম্যালেরিয়া, ইয়েলো ফিভার, ডেঙ্গু এবং জিকা ভাইরাসের মতো রোগ মশার মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে ছড়ায়।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় মশাবাহিত রোগে। যদিও এই গবেষণা একটি নির্দিষ্ট অরণ্য এলাকাকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে, গবেষকদের ধারণা পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই একই ধরনের প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
সমাধানের পথ কোথায়
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর প্রধান সমাধান বনভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা। বন ধ্বংস কমলে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বাড়বে এবং মশা আবার তাদের স্বাভাবিক খাদ্যের উৎসে ফিরে যেতে পারে।
গবেষকদের ভাষায়, মানুষ বনভূমির কাছাকাছি বাস করতেই পারে, কিন্তু প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা জরুরি। সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গবেষক দল এখন আটলান্টিক অরণ্যে মশার চলাচল ও আচরণ নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি তারা নতুন ধরনের ফাঁদ তৈরি করছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















