স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে এখন অনেক তরুণই ফিরে যাচ্ছে পুরোনো দিনের শখের দিকে। সূচিকর্ম, বাগান করা, মাটির কাজ, পাখি দেখা কিংবা চিঠি লেখার মতো অফলাইন কর্মকাণ্ড আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তরুণ প্রজন্মের কাছে।
স্ক্রিনের বাইরে সময় খোঁজার চেষ্টা
২৩ বছর বয়সেই এমা ম্যাকট্যাগার্ট বুঝতে শুরু করেন, তার নিজের জন্য অবসর সময় খুবই কম। তিনি বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। কাজ শেষে লগ আউট করলেও বেশিরভাগ সময় কেটে যেত ফোনে।
একসময় তিনি ও তার রুমমেটরা ঠিক করলেন—ফোনে সময় কাটানোর বদলে নতুন কোনো শখ খুঁজবেন। সেই খোঁজেই তারা শুরু করেন সূচিকর্ম বা নিডলপয়েন্ট। শৈশবে আত্মীয়দের কাছ থেকে এই কাজ কিছুটা শিখেছিলেন ম্যাকট্যাগার্ট, কিন্তু বহু বছর তা আর করা হয়নি।
এখন সেটাই তার জীবনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে।
তার ভাষায়, কাজের চাপ বা মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে মন সরাতে হাতে কিছু করা সত্যিই খুব আরামদায়ক। এতে ফোনে উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল করার বদলে মনোযোগ অন্য দিকে যায়।
তরুণদের মধ্যে ‘অ্যানালগ’ শখের উত্থান
ম্যাকট্যাগার্টের মতো আরও অনেক তরুণ এখন প্রযুক্তিনির্ভর জীবন থেকে কিছুটা বিরতি নিতে অ্যানালগ বা অফলাইন শখের দিকে ঝুঁকছেন। এতে তারা আবার ফিরে পাচ্ছেন শৈশবের সৃজনশীলতা ও নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দ।
মজার বিষয় হলো, এই অফলাইন শখগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়তেও সাহায্য করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
অনলাইনে অনেকেই এসব শখকে ‘দাদির শখ’ বা ‘গ্র্যান্ডমা হবি’ বলে উল্লেখ করেন। কারণ ঐতিহ্যগতভাবে এগুলো বয়স্কদের সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে বোনা, বাগান করা কিংবা সূচিকর্ম।

তবে এখন শুধু এসবই নয়, মাটির পাত্র তৈরি, কাগজ ভাঁজের শিল্প, এমনকি লৌহকারের কাজের মতো পুরোনো শিল্পও নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তরুণদের মধ্যে।
মহামারির সময় অনেকেই অবসর সময়ে এসব শখ শুরু করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো সাময়িক প্রবণতা না হয়ে বরং স্থায়ী আগ্রহে পরিণত হয়েছে।
শখ থেকে ব্যবসা
এখন ২৬ বছর বয়সী ম্যাকট্যাগার্ট নিজেকে খুব দক্ষ কারুশিল্পী বলে মনে না করলেও তিনি ‘হোয়াটস দ্য স্টিচ’ নামে একটি নিডলপয়েন্ট ব্যবসা শুরু করেছেন। একই নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার জনপ্রিয় পেজ রয়েছে।
তার তৈরি ক্যানভাস, বিভিন্ন সরঞ্জাম ও ডিজিটাল নকশা এখন বিক্রি হয় অনলাইনে। তার কাজের বিশেষত্ব হলো ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পে তরুণদের রসবোধ ও আধুনিক ভাবনার মিশ্রণ।
মানসিক স্বস্তি ও সাফল্যের অনুভূতি
জেমস ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেমি কার্টজ বলেন, এসব শখ উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। কারণ এসব কাজে মনোযোগ দিতে হয় এবং ধৈর্য দরকার।
তার মতে, অনেক মানুষ জীবনে শখের গুরুত্ব ভুলে গেছেন বা ব্যস্ততার কারণে এগুলোকে অগ্রাধিকার দেন না। অথচ সামান্য সময় বের করেও এসব কাজে যুক্ত হওয়া খুবই উপকারী।
বন্ধুদের সঙ্গে মাহজং খেলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ক্লারা শারম্যান বলেন, খেলায় মন দিলে যেন এক ধরনের প্রশান্ত অবস্থায় পৌঁছানো যায়।
তার ভাষায়, তখন মনে হয় যেন শুধু তিনি, তার বন্ধুরা এবং খেলাটিই একটি ছোট জগত তৈরি করেছে—যেখানে বাইরের পৃথিবী থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিচ্ছিন্ন থাকা যায়।
প্রযুক্তি ও শখের নতুন সম্পর্ক
সব তরুণ অবশ্য প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে যেতে চান না। কেউ কেউ মনে করেন আধুনিক প্রযুক্তি বরং শখকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
পাখি পর্যবেক্ষক, শিল্পী ও অনলাইন নির্মাতা আইজাইয়া স্কট বলেন, ‘ইবার্ড’ নামের একটি অ্যাপ তার অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অ্যাপের মাধ্যমে পাখি পর্যবেক্ষকেরা তাদের দেখা প্রজাতির তথ্য নথিভুক্ত করতে পারেন এবং গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমেও অবদান রাখতে পারেন।
স্কটের মতে, অনেকেই বলেন তার প্রজন্ম ফোনে আটকে থাকে। কিন্তু প্রযুক্তি অনেক সময় এমন শখের দরজা খুলে দেয়, যেগুলো হয়তো ভুলে যাওয়া হচ্ছিল বা সহজে শুরু করা কঠিন ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার সাভানাহ শহরে বসবাসকারী স্কট বলেন, পাখি দেখা অনেকটা ভিডিও গেমের মতো অনুভূতি দেয়। ছোটবেলায় যে পোকেমন গেম খেলতেন, তার সঙ্গে তিনি এই অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান।
ভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ মানে যেন নতুন মানচিত্র খুলে যাওয়া, আর নতুন প্রজাতির পাখি দেখা মানে যেন উচ্চ স্কোর অর্জন করা। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৮০০ প্রজাতির পাখি দেখেছেন।
পাখি দেখা তাকে শুধু একটি শখই দেয়নি, বরং প্রকৃতি রক্ষার একটি লক্ষ্যও দিয়েছে। তিনি ‘রুকারি অ্যান্ড রুটস কনজারভেন্সি’ নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বন্যপ্রাণীর আবাস রক্ষায় জর্জিয়ার রিনকন এলাকায় ১৬ একর জমিও কিনেছেন।
পুরোনো শিল্পে নতুন প্রাণ
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অনেক ঐতিহ্যবাহী শিল্পীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার কারণে তারা এখন সফল ব্যবসাও গড়ে তুলতে পারছেন।
আনা ওয়েয়ার একজন পূর্ণকালীন লৌহকার। অনলাইনে তিনি ‘অ্যানভিল আনা’ নামে পরিচিত।
তিনি যখন টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন, তখন থেকেই আন্তর্জাতিক দর্শকদের আগ্রহ বাড়তে থাকে।
তার মতে, অতিরিক্ত ডিজিটাল জীবনের ক্লান্তি এবং নিম্নমানের দ্রুত উৎপাদিত পণ্যের কারণে মানুষ এখন টেকসই জিনিসের মূল্য বুঝতে শুরু করেছে।
তার তৈরি বিশেষ ধরনের ধাতব স্পার এতটাই জনপ্রিয় যে সেগুলো পেতে প্রায় এক বছরের অপেক্ষার তালিকায় থাকতে হয়।
ওয়েয়ার বলেন, মানুষ এখন দীর্ঘস্থায়ী পণ্য চায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই কারুশিল্পের মূল্যও তাই নতুন করে উপলব্ধি করা হচ্ছে।
শখ থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্প্রদায়
অনেক শখপ্রেমী তাদের মধ্যে শক্তিশালী সম্প্রদায়ের অনুভূতিও খুঁজে পান।
ক্রিস্টি ল্যান্ডিং ‘ভার্স অ্যান্ড সিপ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, যেখানে কবি ও কবিতাপ্রেমীরা যুক্ত হন। তিনি অনলাইনে চিঠি লেখা, মোমের সিল ব্যবহার, কাগজ ভাঁজের শিল্পসহ নানা কাগজভিত্তিক কাজের ভিডিও প্রকাশ করেন।
তার দর্শকেরা শুধু সরঞ্জাম সম্পর্কে জানতে চান না, বরং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও আগ্রহী।
অনেকের অনুরোধে তিনি ‘পেন পাল’ মিলিয়ে দেওয়ার একটি সেবাও চালু করেছেন, যাতে মানুষ চিঠির মাধ্যমে নতুন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
এছাড়া তিনি ‘ভার্স অ্যান্ড সিপ মেইল ক্লাব’ চালু করেছেন। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে তিনি একটি মৌলিক কবিতা ও চায়ের প্যাকেট পাঠান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শতাধিক সদস্যের কাছে।
তার আশা, এই অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে সেই শান্তি ও আনন্দের অনুভূতি জাগাবে—যেমনটি এক কাপ চা হাতে নিয়ে কাগজে ছাপা কবিতা পড়ার সময় হয়।
তিনি বলেন, দ্রুত গতির ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে তিনি একটু ধীর মুহূর্ত তৈরি করতে চান, যা মানুষকে স্ক্রল করা থামাতে বাধ্য করবে।
অস্থায়ী প্রবণতা নয়
এসব শখে যুক্ত অনেকেই মনে করেন, এটি কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়। বরং প্রযুক্তিনির্ভর জীবন থেকে সচেতনভাবে একটু ধীর, বাস্তব জগতের দিকে ফিরে যাওয়ার একটি পথ।
‘দাদির শখ’ বলে যে নামটি দেওয়া হয়েছে, সেটিও ম্যাকট্যাগার্ট হাসিমুখে মেনে নেন।
তিনি মজা করে বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি যেন একটু দাদির মতো ছিলেন। তাই এই শখই যখন তার পেশা হয়ে উঠেছে, সেটি তার কাছে বেশ মানানসই মনে হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















