ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় প্রাথমিক সামরিক তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তের প্রাথমিক ফল বলছে, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য নির্ধারণের ভুলের ফলেই ঘটেছে। এই হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। সাম্প্রতিক সময়ে এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক ভুলগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভুল লক্ষ্য নির্ধারণে ঘটল বিপর্যয়
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাব শহরের শাজারাহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কাছাকাছি একটি নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাতে গিয়ে ভুলবশত স্কুলটিকেই সামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য যে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল পুরোনো। সেই পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার স্থানাঙ্ক তৈরি করা হয়। ফলে যে ভবনটি বহু বছর আগে সামরিক ঘাঁটির অংশ ছিল, সেটিকে এখনও সামরিক স্থাপনা হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।
শিশুদের স্কুল একসময় ছিল সামরিক ঘাঁটির অংশ
তদন্তে আরও জানা গেছে, যে স্থানে এখন স্কুলটি রয়েছে সেটি আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটির অংশ ছিল। তবে বহু বছর আগে সেটি সামরিক ব্যবহারের বাইরে চলে যায় এবং সেখানে স্কুল চালু হয়।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ওই এলাকা ধীরে ধীরে একটি স্কুলে রূপান্তরিত হয়। সেখানে নতুন প্রবেশপথ তৈরি করা হয়, খেলার মাঠ আঁকা হয় এবং ভবনের দেয়াল শিশুদের উপযোগী রঙে রঙিন করা হয়।
তদন্তে উঠে আসছে তথ্য যাচাইয়ের ব্যর্থতা
প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া পুরোনো তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। সামরিক অভিযানে সাধারণত একাধিক সংস্থা তথ্য যাচাই করে থাকে। কিন্তু যুদ্ধের দ্রুতগতির পরিস্থিতিতে সেই যাচাই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ত্রুটি ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন কীভাবে পুরোনো তথ্য ব্যবহৃত হলো এবং কেন তা নতুন তথ্য দিয়ে যাচাই করা হয়নি। এই ঘটনার সঙ্গে বিভিন্ন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

দায় নিয়ে বিতর্কে রাজনৈতিক উত্তাপ
এই হামলার পর দায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমদিকে দাবি করেছিলেন, হামলাটি ইরানই চালিয়ে থাকতে পারে। তবে চলমান তদন্তে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দায়ই সামনে আসছে বলে জানা গেছে।
এতে সামরিক অভিযানের ওপর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এবং প্রশাসনের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত এখনও শেষ হয়নি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগে আরও তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে।
অতীতের বড় সামরিক ভুলের সঙ্গে তুলনা
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা অতীতের একটি বড় সামরিক ভুলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধের সময় পুরোনো মানচিত্রের কারণে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে বেলগ্রেডে চীনা দূতাবাসে বোমা হামলা হয়েছিল।
তখনও গোয়েন্দা তথ্য যাচাইয়ের ব্যর্থতা বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান ঘটনাও একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে কীভাবে এই ভুল ঘটল এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন সেই দিকেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















