ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জঙ্গলজুড়ে ছয় দশক ধরে চলা মাওবাদী বিদ্রোহ কি শেষের পথে? সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিদ্রোহীদের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এমন প্রশ্নই এখন সামনে আসছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুরোপুরি সমাপ্তির ঘোষণা এখনও সময়সাপেক্ষ।
বিদ্রোহের দীর্ঘ ইতিহাস ও উত্থান
উনিশ শতকের শেষভাগে নয়, বরং ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রাম থেকে শুরু হয় এই আন্দোলন, যা পরে “নকশাল” নামে পরিচিতি পায়। প্রথমদিকে দমন করা হলেও, আশির দশকে বিদ্রোহীরা দুর্গম জঙ্গল এলাকায় ঘাঁটি গড়ে তোলে। সেখানে দরিদ্র ও অবহেলিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে।
এই গোষ্ঠী নিজেদেরকে জমি রক্ষা ও উন্নয়নের নামে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে বহু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০০০ সালের পর থেকে ১২ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এই সংঘাতে।
শক্তি হ্রাস ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাফল্য
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারের কঠোর অভিযানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৪ সাল থেকে শত শত বিদ্রোহী নিহত হয়েছে এবং অনেকেই আত্মসমর্পণ করেছে। একসময় দেশের এক-তৃতীয়াংশ জেলায় সক্রিয় থাকা এই আন্দোলন এখন সীমিত হয়ে মাত্র কয়েকটি জেলায় টিকে আছে।
বিদ্রোহীদের একসময়ের শক্ত ঘাঁটি ছত্তিশগড়ের কুতুল গ্রাম থেকেও তাদের প্রভাব প্রায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, কারণ তাদের অভিযোগ ছিল বিদ্রোহীরা জোর করে কাজ করাতো, খাদ্য নিতো এবং মতাদর্শ চাপিয়ে দিতো।

আদর্শ বনাম বাস্তবতা
অনেক গ্রামবাসীর মতে, বিদ্রোহীদের আদর্শ আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে তা কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। শিক্ষা সীমিত রাখা, বাধ্যতামূলক নিয়ম আরোপ এবং বিরোধীদের হত্যা—এসব অভিযোগও উঠে এসেছে।
সরকারের কৌশল: প্রলোভন ও কঠোরতা
সরকার একদিকে সামরিক অভিযান চালালেও অন্যদিকে আত্মসমর্পণকারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামগুলোতে রাস্তা, ইন্টারনেট এবং সরকারি সেবার বিস্তার ঘটানো হয়েছে, যা বিদ্রোহীদের প্রভাব কমাতে সাহায্য করেছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। বিশেষ করে সাবেক বিদ্রোহীদের নিয়ে গঠিত বিশেষ বাহিনী নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশঙ্কা
বিদ্রোহ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে নতুন এক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আদিবাসী এলাকাগুলোর নিচে থাকা খনিজ সম্পদ নিয়ে বড় কোম্পানির আগ্রহ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, উন্নয়নের নামে তাদের জমি হারাতে হতে পারে, যা আবার নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















