থাইল্যান্ডের উত্তরের শহর চিয়াং মাইয়ের এক ছোট্ট রাতের বাজারে ভেসে আসে মিয়ানমারের খাবারের গন্ধ, বাজে গান, জ্বলে আগুন—কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। হাজার হাজার মিয়ানমারের মানুষ সেখানে নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন, যাদের অনেকেই নিজ দেশ থেকে পালিয়ে এসেছেন সহিংসতা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার ভয়ে।
নির্বাসনের পথে নতুন জীবন
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে শুরু হয় কঠোর দমন-পীড়ন। সেই সময় প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়েন অনেকেই। তাদেরই একজন কো থেট, যিনি চিয়াং মাইয়ে একটি পরিত্যক্ত জায়গা পরিষ্কার করে গড়ে তুলেছেন একটি ছোট বাজার। তার ভাষায়, বিদেশের মাটিতে শেকড় গাড়া এখন তাদের জন্য একমাত্র পথ।
জাতিসংঘের হিসাবে, বর্তমানে থাইল্যান্ডে প্রায় ৪৬ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক রয়েছেন, যার অর্ধেকেরও বেশি এসেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। এদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলীসহ নানা পেশার দক্ষ মানুষ।
স্বপ্ন হারিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই
নিয়ে চি, একসময় তথ্যপ্রযুক্তি পড়তেন এবং সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা তার সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। সংঘাতের সময় তিনি বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে চিকিৎসা সেবায় যুক্ত হন। সীমিত ওষুধ আর সরঞ্জামের কারণে জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়লে তিনি থাইল্যান্ডে চলে আসেন পরিবারের জন্য উপার্জনের আশায়। কিন্তু এখানেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

আইনি সুরক্ষার অভাব ও ঝুঁকি
থাইল্যান্ড এখনও শরণার্থী সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। ফলে আশ্রয়প্রার্থীরা কোনো আনুষ্ঠানিক সুরক্ষা পান না। অনেকেই নিয়মিত অভিযানের মুখে পড়েন এবং সীমান্তে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে থাকেন। এমনও অভিযোগ রয়েছে যে কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী অর্থের বিনিময়ে অনানুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র দিয়ে থাকে।
যদিও কিছু ক্ষেত্রে অস্থায়ী কাজের অনুমতি পাওয়া যায়, তবে সেই প্রক্রিয়া জটিল ও ব্যয়বহুল। ফলে অনেকেই অবৈধ অবস্থাতেই কাজ করতে বাধ্য হন।
অর্থনীতি বনাম রাজনীতি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষিত ও দক্ষ এই জনশক্তি থাইল্যান্ডের স্থবির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারে। দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছাচ্ছে এবং জন্মহার কমে যাচ্ছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতায় এই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠছে।
মানবিক সংযোগের চেষ্টা
কো থেটের বাজারে ঝোলানো একটি ব্যানারে লেখা—প্রতিটি মানুষের একটি গল্প আছে। এই বার্তার মধ্য দিয়েই তিনি স্থানীয় থাই এবং মিয়ানমারের মানুষদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান। যদিও অনেকেই একদিন দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখেন, বাস্তবতা বলছে সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















