মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর্যটননির্ভর শহর দুবাইয়ে। পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার স্বল্প আয়ের কর্মী। ব্যবসা প্রায় থমকে যাওয়ায় অনেকের আয় অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, আর জীবনযাপনও হয়ে পড়েছে কঠিন।
পর্যটকশূন্য সৈকত ও নিস্তব্ধ বিনোদন কেন্দ্র
দুবাইয়ের জনপ্রিয় জুমেইরা বিচ রেসিডেন্স এলাকায় যেখানে সাধারণত পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে, সেখানে এখন ভিন্ন চিত্র। সারি সারি রোদ পোহানোর চেয়ারের সামনে প্রায় ফাঁকা সমুদ্র। রেস্তোরাঁর বারান্দাগুলো নির্জন, আর স্মারক সামগ্রী, জলক্রীড়া কিংবা সুগন্ধির দোকানিরা অপেক্ষা করছেন কোনো পথচারী গ্রাহকের জন্য।
সামনের সমুদ্রের ওপারে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ফেরিস হুইল আইন দুবাইও থেমে আছে প্রায়। নিচে অবস্থিত মোমের জাদুঘরেও দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম, যদিও আকর্ষণীয় ছাড় দেওয়া হয়েছে।
একজন শ্রীলঙ্কান কর্মী, যিনি জেট স্কি ভাড়ার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, জানান কয়েক দিন ধরে একটিও গ্রাহক পাননি। তার কথায়, জীবনে তিনি কখনো এমন নিস্তব্ধ দুবাই দেখেননি।

যুদ্ধের প্রভাবে পর্যটন খাতের ধস
কৃত্রিম দ্বীপ, উঁচু অট্টালিকা এবং আধুনিক বিনোদনের জন্য দুবাই বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গত বছর প্রায় এক কোটি ছিয়ানব্বই লাখ পর্যটক শহরটি ভ্রমণ করেন।
কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে অনেক পর্যটক সফর বাতিল করেছেন। সাধারণত এই সময়টি পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুম হলেও এবার হোটেল, বিনোদনকেন্দ্র ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলো প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাত প্রতিদিন প্রায় ছয়শ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
স্বল্প আয়ের কর্মীদের জীবনে অনিশ্চয়তা
দুবাইয়ের পর্যটন শিল্পে কাজ করেন বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক। অনেকেই দক্ষিণ এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জীবনের আশায় সেখানে পাড়ি জমান।
তাদের একজন জানান, নির্ধারিত সময়েও তিনি বেতন পাননি। বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে ভাড়া মেটানোর পর হাতে খুব সামান্য টাকা অবশিষ্ট আছে। দেশে ফেরাও সহজ নয়, কারণ ফ্লাইট কমে যাওয়ায় বিমানভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
আরেকজন সুগন্ধি বিক্রেতা বলেন, তিনি যুদ্ধের ভয় পান না, কারণ নিজের দেশেও যুদ্ধ দেখেছেন। কিন্তু বিক্রি না থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যাবে—এই আশঙ্কাই তাকে বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

হোটেল খাতে মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতা
ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে দুবাইয়ের অনেক বিলাসবহুল হোটেল বড় ধরনের মূল্যছাড় ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য স্থানীয় বাসিন্দা ও তাদের পরিবারকে আকর্ষণ করা।
কৃত্রিম দ্বীপ পাম জুমেইরাতেও পর্যটক টানতে নানা অফার দেওয়া হচ্ছে। তবে সংঘাতের শুরুতে একটি হোটেলে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

শান্তি ফিরলেই ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দেশের নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তিতে আঘাত করতে পারে।
তবে অনেকের বিশ্বাস, স্থিতিশীলতা ফিরলে দুবাই আবার দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। অতীতেও আর্থিক সংকট ও মহামারির পর শহরটি দ্রুত পুনরুদ্ধার করেছে। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো অঞ্চলে দ্রুত শান্তি ফিরে আসা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















