চীনা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ড্রোন শিল্প গড়ে তুলতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তাইওয়ান। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশটি এখন এমন ড্রোন তৈরি করছে, যেগুলোতে নেই কোনো চীনা উপাদান। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এই “চীনমুক্ত” ড্রোন ইতিমধ্যেই পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে বড় চাহিদা তৈরি করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেই নতুন শিল্পের শুরু
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। সেই সময় তাইওয়ান সরকার নিজস্ব ড্রোন শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়।
তাইপেইয়ের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ডেভিড লিউ আগে কখনও সামরিক ড্রোন তৈরি করার কথা ভাবেননি। কিন্তু সরকারের উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর তার প্রতিষ্ঠান কুনওয়ে প্রযুক্তি এই খাতে প্রবেশ করে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পোল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনে দুই ধরনের কোয়াডকপ্টার ড্রোন রপ্তানি করছে। এর মধ্যে বড় ড্রোনটি আট কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে সক্ষম।
চীনের তৈরি ড্রোনের তুলনায় এগুলোর দাম প্রায় দ্বিগুণ হলেও একটি বড় সুবিধা রয়েছে—এগুলোর কোনো যন্ত্রাংশই চীন থেকে আসে না।

রপ্তানিতে বিস্ময়কর উত্থান
দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ান অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল না। ১৯৪৯ সালে জাতীয়তাবাদী সরকার দ্বীপটিতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে দেশটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র আমদানি করে এসেছে।
তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে।
২০২৪ সালে তাইওয়ানে ড্রোন উৎপাদন ছিল প্রায় দশ হাজার ইউনিট। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে বারো গুণেরও বেশি হয়েছে।
একই সময়ে ড্রোন রপ্তানি বেড়েছে প্রায় পঁয়ত্রিশ গুণ, যা গত বছর দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ তেইশ হাজার ইউনিটে। উৎপাদিত ড্রোনের প্রায় সবই বিদেশে বিক্রি হয়েছে।
এই রপ্তানির বড় ক্রেতাদের মধ্যে ছিল চেক প্রজাতন্ত্র ও পোল্যান্ড। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ড্রোনের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, যা নির্মাতাদের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
চীনমুক্ত ড্রোন শিল্প গড়ার লক্ষ্য
তাইওয়ান সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যেই সম্পূর্ণ চীনমুক্ত ড্রোন শিল্প গড়ে তোলা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৮ সালের মধ্যে বছরে এক লাখ আশি হাজার ড্রোন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৩ সালের মধ্যে নিজেদের সামরিক বাহিনীর জন্য দুই লাখের বেশি ড্রোন কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্বে মোট ড্রোন উৎপাদনের প্রায় সত্তর থেকে আশি শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে অনেক দেশ এখন সরবরাহ শৃঙ্খল ও গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে তাইওয়ান।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নতুন বাজার
প্রযুক্তি উৎপাদনে শক্তিশালী দেশ হিসেবে তাইওয়ানের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ তৈরিতে। ফলে দ্রুত নিজেদের ড্রোন যন্ত্রাংশ তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করছে দেশটি।
আগে কুনওয়ে প্রযুক্তি তাদের প্রায় চল্লিশ শতাংশ যন্ত্রাংশ চীন থেকে সংগ্রহ করত। এখন তারা সব উপাদান স্থানীয়ভাবে বা জাপানের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ থেকে সংগ্রহ করছে।
যদিও এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে, তবুও কোম্পানিটির হিসাব অনুযায়ী তাদের ড্রোন জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার সমমানের ড্রোনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে তৈরি হয়।
নতুন বাজারও খুলছে দ্রুত। প্রতিষ্ঠানটি গত বছর ভারতে সামরিক ও বেসামরিক ড্রোন তৈরির জন্য অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।

পশ্চিমা জোটের সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশের চেষ্টা
আরও কয়েকটি তাইওয়ানি প্রতিষ্ঠান ইউরোপে ড্রোন বা যন্ত্রাংশ রপ্তানি করছে। কেউ কেউ সেখানে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে।
থান্ডার টাইগার নামের একটি প্রতিষ্ঠান পোল্যান্ডে কারখানা স্থাপনের আলোচনা করছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও তাদের বিক্রি বাড়ছে।
তবে তাদের মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর ওহাইও অঙ্গরাজ্যে ড্রোন মোটর তৈরির পরিকল্পনা করেছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
তবে এই শিল্পের সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
তাইওয়ান বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্ধপরিবাহী চিপ উৎপাদনকারী দেশ হলেও ড্রোনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু নিয়ন্ত্রণ চিপ ও সফটওয়্যার এখনো দেশে তৈরি হয় না। এই ঘাটতি পূরণে সরকার প্রায় এক দশমিক চার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
আরেকটি বাধা হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। বিরোধী দল প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা আটকে দিয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে বিশ্ববাজারে ড্রোনের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবু বড় সুযোগ দেখছে তাইওয়ান
তাইওয়ানের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, চীনা যন্ত্রাংশ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ড্রোনে চীনা উপাদান নিষিদ্ধ করেছে এবং বিদেশি কিছু ড্রোন আমদানিতেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশও একই পথে এগোচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে চীনের সস্তা ড্রোনের বিকল্প তৈরি করতে সময় লাগলেও তাইওয়ান ইতিমধ্যেই শক্ত অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















