দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে বাড়ির বাজার এখন অনেকের কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বাড়ির দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আবাসন। এই সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে দেশটির সরকার, আর সেই নীতিই এখন বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের প্রতীকী পদক্ষেপ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং সিউলে নিজের ফ্ল্যাট বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করেন। এর মাধ্যমে তিনি একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন—বাড়ি থাকার জন্য, বিনিয়োগের জন্য নয়।
তার মতে, সিউলের আবাসন বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিই দেশের বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মূল উৎস। ২০২৪ সালে সিউল মহানগর এলাকায় বাড়ির দাম ও আয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৮.৭। গত বছর ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ, যা প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি।

জল্পনা কমাতে সরকারের কঠোর নীতি
গত বছরের জুনে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট লি আবাসন বাজারে জল্পনা কমাতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। নতুন বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ঋণের নিয়ম কঠোর করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সিউল ও আশপাশের এলাকায় নতুন কেনা বাড়িতে অন্তত দুই বছর মালিককে নিজে বসবাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একাধিক বাড়ির মালিকদের জন্য সম্পত্তি বিক্রিতে করছাড়ের সুবিধাও আগামী মে মাসে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তবে এই সংকট নতুন নয়। সিউল মহানগর এলাকায় দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ বসবাস করে, ফলে আবাসনের চাহিদা সব সময়ই অত্যন্ত বেশি। কিন্তু নতুন বাড়ি নির্মাণের গতি খুবই ধীর, যা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ভাড়াবাজারে বড় পরিবর্তন
দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি বিনিয়োগের একটি জনপ্রিয় খাত। অনেক বাড়ির মালিক একাধিক সম্পত্তি কিনে ভাড়া দিয়ে থাকেন। সিউলের ব্যক্তিগত ভাড়াবাজারের প্রায় ৮৬ শতাংশই এসব ব্যক্তিমালিকের হাতে।

এখানে বহুল ব্যবহৃত একটি ব্যবস্থা হলো ‘জেওনসে’। এতে মাসিক ভাড়া না দিয়ে ভাড়াটিয়ারা বড় অঙ্কের অগ্রিম জমা দেন, যা বাড়ির মালিকরা বিনিয়োগে ব্যবহার করেন এবং চুক্তি শেষে তা ফেরত দেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অগ্রিম অর্থ এত বেশি হয়ে গেছে—গড়ে প্রায় ৫৯ কোটি ওন—যে অনেকের পক্ষে তা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক জমা টাকা ফেরত না দেওয়ায় ভাড়াটিয়াদের উদ্বেগও বেড়েছে।
এর ফলে এখন ধীরে ধীরে মাসিক ভাড়ার ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পাঁচ বছর আগে যেখানে এটি তুলনামূলক কম ব্যবহৃত ছিল, এখন প্রায় ৬০ শতাংশ ভাড়ার লেনদেনই মাসিক ভাড়াভিত্তিক।
নতুন সুযোগ দেখছে বড় বিনিয়োগকারী
আবাসন নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ এবং একা বসবাসকারীর সংখ্যা বাড়ার কারণে নতুন সুযোগ দেখছে বড় বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী। সিউলের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবার এখন একক বাসিন্দার।
এই পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বড় ভাড়াবাড়ি ব্যবসা গড়ে তোলার উদ্যোগও বাড়ছে।

রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বড় পরীক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ায় আবাসন সমস্যা অতীতে বহু প্রেসিডেন্টের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো অর্ধেকের বেশি নাগরিক প্রেসিডেন্ট লির আবাসন নীতিকে সমর্থন করছেন।
অনেকেই মনে করেন, ভবিষ্যতে বাড়ির দাম কমতে পারে, যদিও ভাড়া বাড়তে পারে বলে ধারণা রয়েছে।
ইতিমধ্যে সিউলের অভিজাত এলাকা গ্যাংনামের মতো জায়গায় বাড়ির দাম কিছুটা স্থির হয়েছে। করছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অনেক মালিক বাজারে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ায় সরবরাহ বেড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে আসা এসব বাড়ি প্রথমবারের ক্রেতাদের জন্য সব সময় উপযোগী বা সাশ্রয়ী নয়। ফলে সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
জনসংখ্যা পরিবর্তন কি সমাধান আনবে
দক্ষিণ কোরিয়ার দ্রুত বদলে যাওয়া জনসংখ্যা কাঠামো ভবিষ্যতে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে। আগামী প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে সিউলে বসবাসকারী বয়স্ক প্রজন্মের অনেকেই জীবনসীমার কাছাকাছি পৌঁছাবেন।
তাদের বাড়িগুলো তখন নতুন মালিকের হাতে যাবে, ফলে বাজারে বাড়ির সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে সেই পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে, আর রাজনৈতিক বাস্তবতায় এত দীর্ঘ অপেক্ষা করা প্রেসিডেন্টের জন্য সহজ নাও হতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















