ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরেই নানা রেকর্ড ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে গর্ব করতে ভালোবাসে। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে দিল্লিতে এক দিনে সবচেয়ে বেশি মানুষকে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অঙ্গীকার করানোর জন্য বিশ্বরেকর্ডের স্বীকৃতি পেয়েছে সরকার। আবার নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকায় এক ঘণ্টার কম সময়ে দুই লক্ষাধিক চারা রোপণের ঘটনাও রেকর্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এমন নানা অর্জনের পাশাপাশি গত কয়েক মাস ধরে ভারত সরকার আরেকটি বড় দাবি প্রচার করছে—ভারত নাকি এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। বলা হচ্ছে, জাপানকে পেছনে ফেলে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানির পরেই অবস্থান করছে। তবে সাম্প্রতিক সরকারি হিসাব বলছে, বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।
নতুন হিসাব বলছে ভারত এখনও পঞ্চম

গত মাসে ভারতের পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয় মোট দেশজ উৎপাদনের নতুন সংশোধিত হিসাব প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, আগের অনুমানের তুলনায় দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় তিন দশমিক তিন শতাংশ ছোট। বর্তমান হিসাবে ভারতের অর্থনীতির আকার চার ট্রিলিয়ন ডলারের সামান্য নিচে।
এই সংশোধনের ফলে জাপানের সঙ্গে ভারতের ব্যবধানও স্পষ্ট হয়েছে। বাজার বিনিময় হারে জাপানের অর্থনীতি ভারতের তুলনায় প্রায় তিনশো বিলিয়ন ডলার বড়। ফলে বাস্তবে ভারত এখনও বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবেই রয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকলে খুব শিগগিরই ভারত চতুর্থ স্থানে উঠতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি সাময়িক বাধা তৈরি করলেও ভবিষ্যতে অবস্থান বদলানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সংখ্যার গর্ব, বাস্তবতার ফাঁদ
ভারতে অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য এখন খুবই সাধারণ বিষয়। অনেকেই মনে করেন, গত দশকে অর্থনীতির অবস্থান দশম থেকে পঞ্চমে ওঠার পেছনে সরকারের উন্নয়ন নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র র্যাংকিং নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব রাজনৈতিক নেতাদের জন্যই এক ধরনের ফাঁদ তৈরি করতে পারে। কারণ বিশ্বে “শীর্ষ পাঁচ” একটি পরিচিত শ্রেণি হলেও “শীর্ষ চার” নামে তেমন কোনো স্বীকৃত ধারণা নেই।
আরও বড় বাস্তবতা হলো তুলনামূলক অর্থনৈতিক শক্তি। ভারতের অর্থনীতি এখনো চীনের মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আট ভাগের এক ভাগ। জার্মানি, জাপান ও ভারত—এই তিন দেশের অর্থনীতিকে একসঙ্গে ধরলেও তা চীনের অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নয়।
মাথাপিছু আয়ের বাস্তব চিত্র
অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বোঝার জন্য মাথাপিছু আয় বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিতে দেখা যায়, ভারতের মাথাপিছু অর্থনৈতিক অবস্থান জাপানের মতো উন্নত দেশের চেয়ে অনেক দূরে। বরং তা মধ্যম আয়ের দেশের কাছাকাছি।
তবে গত এক দশকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কিছু উন্নতি হয়েছে। বাজারে পণ্য ও সেবার পরিমাণ বেড়েছে, মানুষের আয়ও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

জীবনমান বনাম জীবনের মান
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতের নাগরিকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। বিদেশ ভ্রমণ করে অনেক ভারতীয় ফিরে এসে পরিষ্কার বাতাস, উন্নত সড়ক ও নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গল্প বলেন।
অন্যদিকে দেশের অনেক শহর ও এলাকায় এখনো পানিতে দূষণ, নিকাশির সমস্যা কিংবা অবকাঠামোগত দুর্বলতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। সেতু ভেঙে পড়া বা পানীয় জলে দূষণের ঘটনাও মাঝেমধ্যে সামনে আসে।
এই কারণেই অনেক ভারতীয়ের মধ্যে একটি সাধারণ মন্তব্য শোনা যায়—বিশ্বের বড় অর্থনীতির তালিকায় নাম থাকলেও বাস্তব জীবনের চিত্র এখনও সেই মানের নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত অর্জন হবে তখনই যখন অর্থনীতির আকারের পাশাপাশি নিরাপদ অবকাঠামো, পরিষ্কার পরিবেশ এবং মৌলিক সেবার উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















