গত অর্ধশতকে দারিদ্র্য থেকে বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করেছে চীন। কিন্তু এখন সামনে এসেছে নতুন এক জটিল প্রশ্ন—এই বিপুল সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের হাতে কীভাবে যাবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আধুনিক চীনের ইতিহাসে প্রথম বড় প্রজন্মান্তরের সম্পদ হস্তান্তর দেশের বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে এবং সমাজে নতুন ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।
দ্রুত বেড়েছে সম্পদ, কিন্তু সমানভাবে নয়
১৯৭৮ সালে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের শুরুতে একটি পরিবারের গড় সম্পদের মূল্য ছিল আজকের দামে প্রায় দেড় হাজার ডলার সমপরিমাণ। কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লক্ষ সত্তর হাজার ডলারের সমতুল্য।
কিন্তু এই উন্নতির ফল সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়নি। সর্বোচ্চ ধনী দশ শতাংশ মানুষের হাতে এখন দেশের মোট ব্যক্তিগত সম্পদের প্রায় সত্তর শতাংশ। উন্নত অনেক দেশের তুলনায়ও এই বৈষম্য বেশ বড়।
এই ধনী শ্রেণির বড় অংশ এখন বয়স্ক। ফলে তাদের বিপুল সম্পদ শিগগিরই উত্তরাধিকার হিসেবে সন্তানদের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এক সন্তানের পরিবারে বাড়ছে সম্পদের কেন্দ্রীভবন
চীনের জনসংখ্যা কাঠামোও এই বৈষম্যকে আরও তীব্র করতে পারে। বহু বছর ধরে কার্যকর থাকা এক সন্তান নীতির কারণে অধিকাংশ শহুরে পরিবারে দুই অভিভাবকের সম্পদ শেষ পর্যন্ত একজন সন্তানের হাতেই যাচ্ছে।
ফলে একটি পরিবারে জমে থাকা বিপুল সম্পদ এক প্রজন্মেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ধনী পরিবারগুলোর সন্তানদের মধ্যে বিবাহের প্রবণতাও এই সুবিধা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে ধনী পরিবারগুলোর প্রভাব সমাজে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক ধীরগতিতে বদলাচ্ছে মানসিকতা
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন আগের তুলনায় ধীর। মজুরি ব্যবধান কিছুটা কমলেও সম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে। অনেকের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে জন্মগত সুবিধাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আবাসন বাজারের বড় ধস। বাড়ির দাম কমে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপরীতে অতিধনী মানুষরা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
সমাজে বাড়ছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা
এই পরিবর্তন সমাজে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগে অনেক চীনা বিশ্বাস করতেন কঠোর পরিশ্রম করলে সাফল্য পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে।
যুব বেকারত্বের হার ষোলো শতাংশের বেশি হওয়ায় অনেক তরুণ এখন প্রতিযোগিতার কঠিন দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাও ভাবছেন। বিশাল উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ধনী তরুণদের একটি অংশ আবার কাজের আগ্রহ হারাতে পারেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কর ব্যবস্থার বড় ফাঁক
চীনের কর ব্যবস্থায় এখনো উত্তরাধিকার কর নেই। স্থায়ী সম্পত্তি করও কার্যত অনুপস্থিত। মূলধনী লাভের ওপর করেও রয়েছে নানা ছাড়। ফলে বড় সম্পদ প্রজন্মান্তরে সহজেই স্থানান্তরিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্পদের ওপর কর বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাকে সহজ করা হলে বৈষম্য কিছুটা কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের পদক্ষেপ নিতে সরকার এখনো সতর্ক।

রাজনৈতিক বাস্তবতা বড় বাধা
সম্পদের ওপর কর আরোপ করতে গেলে সম্পদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এতে দুর্নীতিগ্রস্ত অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির গোপন সম্পদের বিষয় সামনে চলে আসতে পারে।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই সরকার এখনো বড় ধরনের সংস্কার থেকে দূরে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সামনে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত কোনো নীতি পরিবর্তন না হয়, তাহলে আগামী এক-দুই দশকে চীনে স্থায়ী ধনী শ্রেণি তৈরি হতে পারে। তার নিচে থাকবে হতাশ ও বৈষম্যে ক্লান্ত একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী।
এই পরিস্থিতি দেশের সামাজিক স্থিতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















