হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং সমুদ্রপথে হামলার পর বৈশ্বিক তেলের সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ উর্ধ্বমুখী হয়ে পড়ে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও তেলের দামে ধাক্কা
মার্চের শুরুতে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার পর তেলের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই দাম নেমে আসে প্রায় ৮০ ডলারে। যুদ্ধের আগে এটি ছিল প্রায় ৭০ ডলার।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। ইরানের হামলার কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে হরমুজ প্রণালি, যার মাধ্যমে বিশ্বে মোট তেলের প্রায় ১৫ শতাংশ সরবরাহ হয়। ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় তেলের ওপর কম নির্ভরশীল হলেও বর্তমান পরিস্থিতি তবু বড় ধাক্কা দিতে পারে। সত্তরের দশকের জ্বালানি সংকটের মতো পরিস্থিতি না হলেও সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেরও বেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পাইপলাইন ও পরিবহন সীমাবদ্ধতার কারণে সেই তেল দ্রুত বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
গ্যাস বাজারেও সংকটের ছায়া
সংকট শুধু তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কাতারের একটি বড় তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানি স্থাপনা ড্রোন হামলার পর বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাজার থেকে হারিয়ে গেছে।

এর প্রভাব এশিয়া ও ইউরোপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এশিয়ার দেশগুলো নতুন উৎস খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর ইউরোপে বছরের এই সময়ে গ্যাস মজুত স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকায় দাম অর্ধেকেরও বেশি বেড়ে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আশঙ্কা
যুদ্ধ শেষ হলেও জ্বালানি বাজার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। সমুদ্রপথে হামলা এবং ড্রোন ব্যবহারের মতো নতুন কৌশল জ্বালানি অবকাঠামোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেই জ্বালানি বাজারে নতুন ধাক্কা দেখা দিতে পারে। এতে বিনিয়োগকারী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে
জ্বালানি দামের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলবে। পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা আবার নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সামনে তখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকার জনগণের চাপের মুখে জ্বালানি ভর্তুকি বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা সরকারি ঋণ বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের শেষ কোথায় তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে বর্তমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও অস্থির, অনিশ্চিত এবং পরিচালনা করা কঠিন করে তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















