চীনে এক নতুন বাস্তবতা দ্রুত স্পষ্ট হয়ে উঠছে—উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদের বিস্তার। কয়েক দশক আগে যেখানে ব্যক্তিগত সম্পদই ছিল বিরল, সেখানে এখন ধনীদের প্রথম প্রজন্ম মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ায় বিপুল সম্পদ নতুন প্রজন্মের হাতে চলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করছে।
সম্পদের নতুন অধ্যায়
চীনে অর্থনৈতিক সংস্কারের পর মাত্র চার দশকের মধ্যেই বিপুল সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে। সেই প্রথম ধনী প্রজন্ম এখন বয়সের ভারে একে একে বিদায় নিচ্ছে। ফলে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদ নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারি সহায়তায় একটি নিবন্ধন কেন্দ্র বয়স্কদের উইল তৈরি করতে সাহায্য করছে। কারণ চীনে অনেক মানুষের কাছে উইল লেখা এখনো নতুন ধারণা। বহু পরিবারে সম্পদের বণ্টন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় ভবিষ্যতে বড় আইনি জটিলতার আশঙ্কা বাড়ছে।
একই সময়ে কিছু অর্থনীতিবিদ বলছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আয়ের উপর কর আরোপ করা উচিত। তাদের মতে, একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন সম্পদ কর ছাড়া রেখে দেওয়া অস্বাভাবিক।

বিপুল সম্পদের পাহাড়
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে চীনে ধনীদের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে শত শত নতুন বিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছে। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ বিপুল।
তবে এখনো অধিকাংশ ধনীই নিজের প্রচেষ্টায় সম্পদ অর্জন করেছেন। তবুও বয়স্ক ধনীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর অর্থ আগামী বছরগুলোতে বিপুল সম্পদ নতুন প্রজন্মের হাতে যাবে। অনুমান করা হচ্ছে, আগামী দশকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ উত্তরাধিকার হিসেবে হস্তান্তর হবে।
উইল না থাকায় বাড়ছে বিরোধ
চীনের অনেক বড় ব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর সম্পদ নিয়ে জটিল বিরোধ দেখা দিয়েছে। অনেকেই জীবদ্দশায় উইল না করায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মামলা শুরু হয়েছে।
একজন খ্যাতনামা পানীয় ব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর তার সম্পদ নিয়ে একাধিক ব্যক্তি সন্তান দাবি করে আদালতে মামলা করেন। এই ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং অনেক উদ্যোক্তা তখনই বুঝতে পারেন উত্তরাধিকার পরিকল্পনার গুরুত্ব।

গত দশকে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আদালতের মামলার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, বিচ্ছেদ, বিদেশে বসবাস এবং জটিল সম্পর্কের কারণে এসব বিরোধ আরও বাড়ছে।
মধ্যবিত্তের সম্পদও ঝুঁকিতে
এই সমস্যা শুধু অতি ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনের বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণিও এখন সম্পদের মালিক। শহরাঞ্চলে বাড়ির মালিকানা ব্যাপক বেড়েছে এবং অনেক পরিবারের প্রধান সম্পদই এখন আবাসন।
কিন্তু উইল ছাড়া কেউ মারা গেলে সম্পদের মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যেখানে কোনো উত্তরাধিকারীই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়।
তরুণদের হতাশা
চীনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তন ভিন্ন এক মনস্তত্ত্ব তৈরি করছে। একসময় অনেকেই বিশ্বাস করতেন কঠোর পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই। এখন সেই বিশ্বাস কমে যাচ্ছে।

অনেক তরুণ মনে করছেন জন্মগত সুবিধা এখন সাফল্যের বড় নির্ধারক। অর্থনৈতিক মন্দা ও সীমিত চাকরির সুযোগ এই হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে কেউ কেউ কঠোর প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখাচ্ছেন।
বৈষম্য নিয়ে রাজনৈতিক উদ্বেগ
চীনের নেতৃত্বও ক্রমবর্ধমান বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা বহুবার বলেছেন, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অতি বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া উচিত নয়।
সরকার একদিকে আয় বাড়ানো, সামাজিক সহায়তা ও দানশীলতার মাধ্যমে বৈষম্য কমাতে চাইছে। অন্যদিকে উত্তরাধিকার কর চালুর প্রশ্নে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। অর্থনীতির মন্দা ও সম্ভাব্য পুঁজি পাচারের আশঙ্কা এ বিষয়ে দ্বিধা তৈরি করেছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—চীনে উত্তরাধিকার সম্পদের যুগ শুরু হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু ধনীদের নয়, পুরো সমাজের অর্থনীতি ও মানসিকতাকেই নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















