হংকং শহরে মানুষের জন্য জায়গা যেন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এমনকি মাছ রাখার মতো জায়গাও অনেকের ঘরে নেই। সংকীর্ণ ঘর, কাঠের আলমারির মতো শোবার জায়গা আর আকাশছোঁয়া ভাড়া—সব মিলিয়ে আবারও হংকংয়ের আবাসন সংকট তীব্র হয়ে উঠছে। শহরের ভাড়া বাড়তে শুরু করায় নিম্নআয়ের বাসিন্দাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
খাঁচা ঘরে বসবাসের বাস্তবতা
হংকংয়ের বহু মানুষ এখনও তথাকথিত “খাঁচা ঘর” বা “কফিন ঘর”-এ বসবাস করেন। এসব ঘর এতটাই ছোট যে সেখানে একটি বিছানা রাখার পর আর প্রায় কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না।
একজন বাসিন্দা, ছদ্মনামে চ্যান, একটি পুরোনো ভবনের ছোট কাঠের আলমারির মতো জায়গায় ঘুমান। উচ্চতা মাত্র প্রায় এক মিটার আর দৈর্ঘ্য শুধু একটি গদি রাখার মতো। একই ফ্ল্যাটে এমন ২৮টি তালাবদ্ধ শোবার জায়গা রয়েছে।

এই ছোট জায়গার জন্যও তাকে প্রতি মাসে প্রায় ২৭০০ হংকং ডলার ভাড়া দিতে হয়। তার এক সহবাসী আগে একটি সারারাত খোলা খাবারের দোকানে ঘুমাতেন, পরে কোনোভাবে এমন একটি শোবার জায়গা ভাড়া নিতে পেরেছেন।
ভাগ করা ফ্ল্যাটে হাজার মানুষের জীবন
হংকংয়ে প্রায় এক লক্ষ পরিবার আরও বড় কিন্তু বিভক্ত ফ্ল্যাটে বাস করে। একটি ফ্ল্যাটকে দেয়াল তুলে কয়েকটি ছোট ঘরে ভাগ করে এসব ইউনিট তৈরি করা হয়।
এই ঘরগুলোতে থাকেন বৃদ্ধ মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি, শিক্ষার্থী, শরণার্থী এবং কম আয়ের শ্রমিকরা। কখনও কখনও একটি ঘরে কেবল একটি কেটলি, ছোট তাক আর বিছানার জায়গা থাকে। কাপড় ঝোলানোর জন্য বিছানার ওপরে একটি স্ক্রু পর্যন্ত ব্যবহার করতে হয়।
আবার বাড়ছে ভাড়া
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হংকংয়ের বাড়ির দাম এক চতুর্থাংশের বেশি কমেছিল। কিন্তু সম্প্রতি বাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। গত কয়েক মাস ধরে বাড়ির দাম আবার বাড়ছে।
ভাড়াও ইতিমধ্যে ২০১৯ সালের সর্বোচ্চ স্তর ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি ভাগ করা ছোট ঘরগুলোর মধ্যম ভাড়াও এক বছরে প্রায় ছয় শতাংশ বেড়েছে।

বাজার পরিবর্তন ও নতুন আইন
এই পরিবর্তনের পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করছে। একটি বাজারের পরিবর্তন, অন্যটি নতুন আইন।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী ছোট বিভক্ত ঘরগুলোর ন্যূনতম আয়তন অন্তত আট বর্গমিটার হতে হবে। পাশাপাশি থাকতে হবে আলাদা শৌচাগার এবং জানালা।
এই নিয়ম কার্যকর করতে আগামী চার বছরে প্রায় ৩৩ হাজার ঘরে বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে। ফলে ভাড়াটিয়াদের আশঙ্কা—সংস্কারের খরচ শেষ পর্যন্ত তাদের ভাড়ার মধ্যেই যোগ হবে।
ভাড়াটিয়াদের উদ্বেগ
ওয়ান চাই এলাকার একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী চ্যাং প্রতি মাসে ২৬০০ হংকং ডলার ভাড়া দেন। তিনি জানেন, সংস্কারের পর কারও ভাড়া ৬০০০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় সত্তর শতাংশ ভাড়াটিয়া পাঁচ শতাংশের বেশি ভাড়া বৃদ্ধি বহন করতে পারবেন না।

সরকারি উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
সরকার অপেক্ষমান মানুষের জন্য সরকারি ভাড়ার বাসা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বর্তমানে শহরের প্রায় ত্রিশ শতাংশ মানুষ সরকারি বাসায় থাকে। আগামী পাঁচ বছরে আরও প্রায় এক লাখ ঊননব্বই হাজার নতুন বাসা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া অস্থায়ী আবাসনের জন্য রূপান্তরিত স্কুল ও সরকারি ভবনে হাজার হাজার ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। তবে সেখানে থাকা যাবে সর্বোচ্চ দুই বছর।
সংকটের শেষ কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়ম বাসস্থানের মান কিছুটা উন্নত করতে পারে। কিন্তু এতে ভাড়া বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ফলে অনেক নিম্নআয়ের মানুষ হয়তো আবারও আরও খারাপ ঘর খুঁজতে বাধ্য হবেন। কেউ কেউ হয়তো অবৈধ আশ্রয়ে বা ছোট কাঠের বাক্সের মতো শোবার জায়গায় রাত কাটাতে বাধ্য হবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















