জাপানের ঐতিহ্যবাহী বরই থেকে তৈরি মদ এখন নতুনভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। বহুদিন ধরে ঘরোয়া বা অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় হিসেবে পরিচিত এই পানীয়কে নতুন পরিচয়ে তুলে ধরতে কাজ করছেন একদল নির্মাতা, কৃষক ও পানীয় বিশেষজ্ঞ। নতুন স্বাদ, ভিন্ন উপাদান এবং আধুনিক পরিবেশনের মাধ্যমে বরই মদকে আবারও জনপ্রিয় করে তুলতে শুরু হয়েছে এক নতুন উদ্যোগ।
ঘরোয়া ঐতিহ্য থেকে আধুনিক পানীয়
জাপানের বরই চাষের প্রধান অঞ্চল ওয়াকায়ামায় বড় হওয়া মামি কুবোতার শৈশব কেটেছে বরই আচার ও বরই রসের স্বাদে। প্রতি গ্রীষ্মে তিনি দেখতেন তার দাদি কাঁচা বরই, মদ ও চিনি দিয়ে বড় কাচের জারে বরই মদ তৈরি করছেন। কয়েক মাসের অপেক্ষার পর সেই পানীয় ধীরে ধীরে ঘন ও সুগন্ধি হয়ে উঠত।
কিন্তু বড় হয়ে দোকানে পাওয়া বরই মদ তাকে হতাশ করেছিল। অধিকাংশ বাজারজাত পানীয় তার কাছে অতিরিক্ত মিষ্টি ও একঘেয়ে মনে হয়েছিল। তখন থেকেই তিনি খুঁজতে শুরু করেন আসল মানের বরই মদের সন্ধান।
অবশেষে ওয়াকায়ামার কিছু উচ্চমানের বরই মদ আবিষ্কার করার পর তিনি টোকিওতে একটি ছোট দোকান চালু করেন, যেখানে বিভিন্ন নির্মাতার তৈরি প্রায় পঞ্চাশ ধরনের খাঁটি বরই মদ পাওয়া যায়। গ্রাহকেরা সেখানে বিভিন্ন স্বাদ পরীক্ষা করে নিজেদের পছন্দের পানীয় বেছে নিতে পারেন।
বরই মদের নতুন সম্ভাবনা
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে বরই মদকে হালকা ও মিষ্টি পানীয় হিসেবে দেখা হয়েছে। অনেকেই এটিকে নতুন মদ্যপানকারীদের জন্য সহজ পানীয় বা নারীদের পছন্দের পানীয় হিসেবে মনে করেন।
কিন্তু ওয়াকায়ামার কৃষক ইয়োহেই আরিমোতো মনে করেন বরই মদের আসল বৈচিত্র্য এখনও অনেকেই জানেন না। তার খামারে বিভিন্ন ধরনের বরই চাষ করা হয়। এর মধ্যে একটি বিরল জাতের বরই থেকে তৈরি পানীয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, যার সুগন্ধ অনেকটা নাশপাতির মতো এবং স্বাদে হালকা ফলের মিষ্টতা রয়েছে।
এই বরই দিয়ে তৈরি তার নতুন পানীয় সাধারণ বরই মদের মতো ভারী বা অতিরিক্ত মিষ্টি নয়। বরং এতে রয়েছে হালকা স্বাদ ও সতেজতার অনুভূতি। বিশেষভাবে প্রস্তুত চালের মদ ব্যবহার করায় বরইয়ের প্রাকৃতিক টকভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্বীকৃতি পেয়েছে ওয়াকায়ামার বরই মদ
বরই মদের মান ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে ওয়াকায়ামা অঞ্চল বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। কয়েক বছর আগে এই অঞ্চলের বরই মদ সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে, যার ফলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে স্থানীয় বরই ব্যবহার করেই এই পানীয় তৈরি করতে হয়।
এই স্বীকৃতি বরই মদের মর্যাদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে কৃত্রিম স্বাদ বা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা যায় না, ফলে পানীয়ের স্বাভাবিক স্বাদ বজায় থাকে।
আধুনিক ককটেলে বরই মদ
নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারাও বরই মদকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। উদ্যোক্তা রিও তাকাদা বরই মদকে ঘরোয়া পানীয়ের সীমা থেকে বের করে আন্তর্জাতিক পানীয় সংস্কৃতির অংশ বানানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন।
তার উদ্যোগে তৈরি পানীয়গুলোতে কখনও ব্যবহার করা হচ্ছে ভিন্ন ধরনের মদ, কখনও যুক্ত করা হচ্ছে সুগন্ধি ভেষজ উপাদান। ফলে এই পানীয় এখন ককটেল তৈরিতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
টোকিওর একাধিক পানশালায় বরই মদ দিয়ে নতুন ধরনের ককটেল তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পানীয়ের স্বাদ ও সুগন্ধ ককটেলের জগতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বদলে যাচ্ছে মানুষের ধারণা
উদ্যোক্তাদের মতে, অনেকেই বরই মদ সম্পর্কে পুরোনো ধারণা নিয়ে বসে আছেন। কিন্তু নতুন ধরনের পানীয় স্বাদ নেওয়ার পর তাদের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের নির্মাতা, কৃষক ও উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় বরই মদ এখন শুধু ঘরোয়া পানীয় নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় আধুনিক পানীয় হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















